নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষা খাতের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। দেশটির সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিনে আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে অংশ নেন।
সহিংসতায় পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি শহরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও দমকলকর্মীদের আগুন নেভানোর কাজেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষা খাতের সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি।
ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল শিক্ষা খাতের দুরবস্থা এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পাশাপাশি একাধিক স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ফরাসি সরকারের হিসাবে, সেদিন প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা ছিলেন। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাই সহিংসতায় জড়িত ছিলেন, এমন কোনো তথ্য নেই। বরং অনেক আন্দোলনকারী শান্তিপূর্ণভাবে তাঁদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
রাজধানী প্যারিসে সন্ধ্যা পর্যন্ত দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। শহরের বিভিন্ন সড়কে আগুন জ্বালানো হয় এবং কয়েকটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
শনিবার বিকেলে প্যারিসের মূল বিক্ষোভ মিছিলটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল। মিছিলে অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানান, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তন চান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ রাস্তায় আগুন জ্বালান এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। শহরের কেন্দ্রস্থলের বিখ্যাত প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকাতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় দাঙ্গা পুলিশের একটি দলকে বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় পুলিশ সদস্যদের লাঠি দিয়ে কয়েকজনকে আঘাত করতেও দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাট চালানো হয়। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লিল শহরে অ্যাপলের একটি দোকানে ভেঙে ঢুকে লুটপাট চালানোর খবরও পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনা বিক্ষোভের মূল দাবিগুলোকে ছাপিয়ে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে লিমোজ শহরের সিটি হলে আগুন লাগার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। আগুনের তীব্রতায় ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকর্মীরা কাজ করেন। তবে ভবনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সংস্কারে কত সময় লাগতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
লিয়ঁ শহরেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে শহরের পর্যটন দপ্তরের ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে ‘একটি ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করেছেন মেয়র গ্রেগরি দুসেত।
একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভবনটি শহরের পরিচিত ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি। সেখানে আগুন লাগার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
স্থানীয় পুলিশের অভিযোগ, কিছু বিক্ষোভকারী দমকলকর্মীদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দিয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁ-এতিয়েনেও সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। শহরটির মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ট্র্যাজেডি কখনোই ঘটার কথা নয়।
তবে বিস্ফোরণে আহত তরুণের পরিচয় কিংবা ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়নি।
এ ধরনের ঘটনা বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে সহিংসতার মধ্যে সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের হতাহতের ঝুঁকিও সামনে এসেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিসের বাইরেও একাধিক শহরে পরিকল্পিত সহিংস কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরে মুখোশ পরা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
তাছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিয়ঁ, পো ও মন্টপেলিয়ের সহ কয়েকটি শহরের সরকারি ও বাণিজ্যিক ভবনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের যাচাই করা একটি ভিডিওতে গ্রেনোবল শহরের কেন্দ্রে একটি অস্বাভাবিক ঘটনার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওতে মুখোশধারী কয়েকজনকে সরু রাস্তা দিয়ে একটি পর্যটকবাহী ট্রেন চালিয়ে অন্তত তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে এগিয়ে নিতে দেখা যায়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ বেড়েছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় প্রায় ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও কর্মীসংকট এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন।
ফ্রান্সে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য পরিচালিত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘লিসে’ নামে পরিচিত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব বিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মীর অভাব রয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, ভবন এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।
শিক্ষার্থীদের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। একইভাবে দুর্বল অবকাঠামো শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও ভবিষ্যৎ সুযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শনিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং অন্যান্য প্রতিবাদী গোষ্ঠীর মানুষ যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সদস্যরাও ছিলেন।
২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি ফ্রান্সের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ নতুন ঘটনা নয়। তবে এবারের সহিংসতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জোরালো হচ্ছে। জনমত জরিপে ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মারিন লে পেন এবং বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজের নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
মেলঁশোঁ নিজেও ফ্রান্সের বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। তবে একই সঙ্গে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেরও নিন্দা জানান।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু মেলঁশোঁর বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও কপট’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, পুলিশকে অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লেকর্নু বলেন, সহিংসতার মাধ্যমে কেউ নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।
অন্যদিকে, মারিন লে পেন অভিযোগ করেন, উগ্র বামপন্থীরা বিক্ষোভকারীদের যৌক্তিক দাবিগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য তিনি মেলঁশোঁকে দায়ীকরেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতাও ভাঙচুরেরঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা সরকারি কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সিটি হলে হামলা চালিয়েছে এবং লুটপাট করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে ও শাস্তি দেওয়া হবে।
সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার থাকলেও অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আন্দোলনের মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষা খাতে শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি মোকাবিলায় সরকার কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন।
এই ঘোষণা শিক্ষা খাতের জনবলসংকট মোকাবিলায় সরকারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিক্ষোভ থামেনি। বরং বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে।
এর পেছনে শুধু শিক্ষকসংকট নয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক অসন্তোষও ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা



