নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। তবে রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে প্রাণ হারান ১০ পর্যটক। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট।
ঘটনাটি ঘিরে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা এবং আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে মামলার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। একই সঙ্গে রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডে এত প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্ট পরিচালনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধারকর্মীরা অভিযান চালিয়ে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। অগ্নিকাণ্ডে আহত আরও ছয়জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, আগুনের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
তবে আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে হয়েছিল, কত দ্রুত তা পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে এবং পর্যটকেরা নিরাপদে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
উখিয়ার রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত নয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। এই ঘটনায় একাধিক পরিবারের সদস্যের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শনাক্ত হওয়া ছয়জন হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
এ ছাড়া নিহত নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত অন্য দুজনের নাম জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।
তবে জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলামের বিস্তারিত পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। একইভাবে নিহত দশম ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তাঁদের নাম, শারীরিক অবস্থা এবং কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জানিয়েছেন। কমিটির প্রতিবেদনে আগুন লাগার কারণ, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় উঠে আসতে পারে।
উখিয়ার রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে এবং রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসন অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
এখন তদন্তের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার অবস্থা এবং ঘটনার পেছনে কোনো অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘন ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
১০ পর্যটকের মৃত্যুর এই ঘটনা নিহতদের পরিবার, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


