বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগ অনেকটাই নির্ভর করে তাদের পাসপোর্টের শক্তির ওপর। কোন দেশের পাসপোর্ট দিয়ে কতগুলো দেশে সহজে প্রবেশ করা যায়, ভিসা ছাড়াই বা স্বল্প আনুষ্ঠানিকতায় ভ্রমণ করা সম্ভব হয়—এসব বিষয় বিবেচনায় তৈরি করা হয় বৈশ্বিক পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান আরও নিচে নেমে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অবস্থানও।
গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্স মূলত একটি আন্তর্জাতিক সূচক, যা নির্ধারণ করে একটি দেশের পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী। এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো—একজন পাসপোর্টধারী ব্যক্তি কতটি দেশে ভিসা ছাড়া, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা সহজ অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন এলে এই সূচকও নিয়মিত আপডেট করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং ভ্রমণ নীতির পরিবর্তন সরাসরি পাসপোর্টের অবস্থানে প্রভাব ফেলে।
নতুন প্রকাশিত গ্লোবাল পাসপোর্ট সূচকে ভারতের অবস্থান আরও এক ধাপ কমেছে। গত বছর ভারত ছিল ১২৪তম স্থানে। এবার সেটি নেমে এসেছে ১২৫ নম্বরে।
ভারতের এই অবস্থান অনেকের কাছে কিছুটা বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রে ভারতীয় পাসপোর্ট প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
বর্তমানে ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা মাত্র ২৬টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন। যদিও সংখ্যাটি একেবারে কম নয়, তবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর তুলনায় এটি অনেক পিছিয়ে।
ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কয়েকটি দেশ এখনও সহজ প্রবেশাধিকার বজায় রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ভুটান
- নেপাল
- জামাইকা
- ম্যাকাউ
- প্যালেস্টাইন
- টিউনিসিয়া
- অ্যাঙ্গোলা
এই দেশগুলোতে ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা তুলনামূলক সহজে ভ্রমণ করতে পারেন। তবে উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এখনও ভারতীয়দের জন্য ভিসা বাধ্যতামূলক রেখেছে।
ভারতীয়দের জন্য বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ দেশে এখনও সরাসরি প্রবেশের সুযোগ নেই। এর মধ্যে রয়েছে—
- যুক্তরাষ্ট্র
- যুক্তরাজ্য
- জার্মানি
- ফ্রান্স
- চীন
এসব দেশে ভ্রমণ করতে হলে পূর্বানুমোদিত ভিসা প্রয়োজন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
শুধু ভারতের ক্ষেত্রেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের পাসপোর্টই তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
নতুন সূচকে দেখা গেছে, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চীন তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। চীনের অবস্থান ১০৪ নম্বরে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান হলো—
বাংলাদেশ — ১৬৬তম
নেপাল — ১৬৪তম
পাকিস্তান — ১৮৮তম
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের অবস্থান অনেক নিচের দিকে থাকায় দেশটির নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়।
চলতি সূচকে বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে ৯টিই ইউরোপের দেশ। এটি প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও ভিসা নীতির ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনও অনেক এগিয়ে।
শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে—
১. সুইডেন
২. সুইজারল্যান্ড
৩. ফিনল্যান্ড
৪. জার্মানি
৫. ডেনমার্ক
৬. নেদারল্যান্ডস
৭. আয়ারল্যান্ড
৮. ব্রিটেন
৯. নরওয়ে
১০. সিঙ্গাপুর
এই দেশগুলোর নাগরিকরা বিশ্বের বিপুল সংখ্যক দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন।
একটি শক্তিশালী পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের সুবিধাই দেয় না। এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অবস্থানকেও তুলে ধরে।
যেসব দেশের পাসপোর্ট শক্তিশালী, তাদের নাগরিকরা ব্যবসা, শিক্ষা, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পান। অন্যদিকে দুর্বল পাসপোর্টধারীদের অতিরিক্ত কাগজপত্র, দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়।
বর্তমান বিশ্বে পাসপোর্টের শক্তি শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ নথির গুরুত্ব বহন করে না; এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

