সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’: কেন ক্ষুব্ধ ভারতের জেন-জি?

‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’: কেন ক্ষুব্ধ ভারতের জেন-জি?

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আয়োজিত ওই সমাবেশে তরুণদের মধ্যে পরিচিত মুখ অভিজিৎ দীপক ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ স্লোগানটি সামনে আনেন। সহজ, কথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো হওয়ায় স্লোগানটি অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ ক্রমেই বড় আকার নিচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি অংশও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্লোগান—‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’—এখন সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক।

দেশটির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এ ধরনের বিস্তৃত রাজনৈতিক ও তরুণদের আন্দোলন সাম্প্রতিক ভারতের রাজনীতিতে বেশ ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।

পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই প্রক্রিয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং এর ফলে তাদের ভোটাধিকার নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল।

এসব সিদ্ধান্তের একটি বড় অংশ এসআইআর-সংক্রান্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।

দিল্লির যন্তর মন্তরে বামপন্থি দল ও বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ শুরু হয় ২ অক্টোবর থেকে। সময়ের সঙ্গে সেখানে ছাত্র ও তরুণদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে।

একই সময়ে কংগ্রেসসহ ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে। ৬ অক্টোবর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও বিরোধী সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে যাওয়ার কর্মসূচি পালন করেন।

রাহুল গান্ধীর দাবি ছিল, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়, বিক্ষোভরত সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে স্মারকলিপি নিতে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিরোধী নেতারা সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবিতে অনড় থাকেন।

এরপর দিল্লি পুলিশ রাহুল গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক করে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিজেপির পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার বদলে রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাতও আরও তীব্র হয়েছে।

শুরুতে ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের একটি সমাবেশের পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা যায়।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আয়োজিত ওই সমাবেশে তরুণদের মধ্যে পরিচিত মুখ অভিজিৎ দীপক ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ স্লোগানটি সামনে আনেন। সহজ, কথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো হওয়ায় স্লোগানটি অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ ভাই।’ পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও একই স্লোগান ব্যবহার করতে শুরু করেন।

এখানেই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ধীরে ধীরে তরুণদের বৃহত্তর অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের ক্ষোভ শুধু নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়ও জড়িয়ে আছে।

সাবেক আমলা জহর সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ছোটবেলা থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকে মনে করছে, সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই।

ফলে ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্ক তাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

জুলাই মাসেও ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। ডাক্তারি ভর্তির পরীক্ষা নিট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ থেকে শুরু করে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নও সেখানে উঠে আসে।

বামপন্থি ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার মতে, তরুণদের মধ্যে এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি।

ভারতের নির্বাচন কমিশন ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সময় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ছিল।

২০২৩ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্টের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। সেই রায়ে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি প্যানেলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথা বলা হয়।

তবে একই বছর সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনের মাধ্যমে নিয়োগের কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধীপক্ষের একজন প্রতিনিধিকে নিয়ে প্যানেল গঠনের বিধান করা হয়।

বিরোধীদের অভিযোগ, এতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব দুইজন হওয়ায় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সরকারের প্রভাব বেড়ে গেছে।

এই নিয়োগ পদ্ধতি নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধনের জন্য ভারতে ‘ফর্ম সিক্স’ ব্যবহার করা হয়। এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই ফর্মের কিছু পরিবর্তন যুক্ত করার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশোধিত ফর্মে নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আবেদনকারীদের কাছে তাদের বা তাদের বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআরের পর তৈরি ভোটার তালিকায় ছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ২৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রেস নোটে দাবি করে, এসআইআরের জন্য ফর্ম সিক্সের সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রটি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে।

কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ফর্ম সিক্সে করা পরিবর্তন সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি।

এই মন্তব্য নির্বাচন কমিশনের আগের বক্তব্যের সঙ্গে অসঙ্গতির অভিযোগকে আরও জোরালো করে। বিরোধীরা এটিকে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আরও একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরে।

ভারতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের সময়ও কৃষক আন্দোলন এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন হয়েছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, আন্দোলনের একটি বড় অংশ সরাসরি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সাবেক আমলা জহর সরকার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭০-এর দশকের জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের তুলনা করেছেন। সে সময় দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুতে ব্যাপক জনআন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

বর্তমান আন্দোলন অবশ্য নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এর সঙ্গে শিক্ষা, চাকরি ও বেকারত্বের মতো বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে।

‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ স্লোগানটি এই আন্দোলনের একটি বড় দিক তুলে ধরেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বদলে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কথ্য ভাষা ব্যবহার করছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই ভাষা এখন রাজনৈতিক দলগুলোও গ্রহণ করছে। অর্থাৎ, তরুণদের তৈরি রাজনৈতিক বক্তব্য ও স্লোগান মূলধারার রাজনীতিতেও জায়গা করে নিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের তরুণ সমাজ এখন আগের তুলনায় বেশি প্রশ্ন করছে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তারা শিক্ষা, চাকরি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়েও কথা বলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সঞ্জীব শ্রীবাস্তবের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকমাসে ভারতের তরুণদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আগে যে পরিস্থিতিকে অনেকে মেনে নিতেন, এখন তরুণদের একটি অংশ সেটি মেনে নিতে চাইছে না।

এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে আগামী দিনের নির্বাচনে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে উত্তর প্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন বিজেপি ও বিরোধীদের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। তরুণদের অসন্তোষ যদি ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলে, তাহলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও বাড়বে।

অন্যদিকে সরকার তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন ধরনের জনসংযোগ কৌশল ব্যবহার করছে। ফলে আগামী দিনে জেন-জি ভোটারদের মন জয় করা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে এবং আগামী নির্বাচনে তার বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে, তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ