নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে হামলার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে হামলাকারী হিসেবে ২৯ বছর বয়সী ওমানি কো-পাইলট হামাম আল-হাম্মামির নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে উগ্রপন্থী মতাদর্শের বিষয়ে উদ্বেগের কারণে ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থা ওমান এয়ার তাকে উড্ডয়নসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দিয়েছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পরে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে চাকরি পান এবং দুবাই-তেল আবিব রুটে দায়িত্ব পালন করেন।
টনার পর হামামকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তদন্তকারীদের কাছে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে উড়োজাহাজটি ইসরায়েলে বিধ্বস্ত করার উদ্দেশ্য তার ছিল। তবে এই তদন্ত এখনো চলমান এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সিএনএন ও এবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাম আল-হাম্মামি ওমান এয়ারের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে বাদ পড়েছিলেন। তার উগ্রপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এবিসির প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তার কাছে উগ্রপন্থী সংশ্লিষ্ট কিছু উপকরণ পাওয়া গিয়েছিল। তবে তখন তার বিষয়ে ওমানের পক্ষ থেকে অন্য বিমান সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষকে কোনো সতর্কতা জানানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একজন উপসাগরীয় কূটনীতিক অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ফ্লাইদুবাইয়ে নিয়োগের আগে হামামের নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই হয়েছিল। তবে ওই যাচাই মূলত তার কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস আছে কি না, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে ছিল বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এখানেই তদন্তকারীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে—আগের কর্মস্থলে কোনো কর্মীর বিষয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলে সেই তথ্য নতুন নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে কীভাবে পৌঁছায় এবং তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কতটা গুরুত্ব পায়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এবিসির প্রতিবেদনে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হামাম তদন্তকারীদের কাছে উড়োজাহাজটি ইসরায়েলে বিধ্বস্ত করার অভিপ্রায়ের কথা ইঙ্গিত করেছেন।
ঘটনার পর তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে। তাই এই পর্যায়ে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যকে তদন্তসংশ্লিষ্ট দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাম আল-হাম্মামি সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ওমানি এবং মা সিরীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুছে ফেলা একটি লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করেন। এরপর ২০২৫ সালের জুনে মরক্কোর রয়্যাল এয়ার মারকে যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকে চলে যান। তার ওই প্রোফাইলে ফ্লাইদুবাইয়ের চাকরির তথ্য ছিল না। তবে তার পরিচিত এক সূত্র সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে যে অ্যাকাউন্টটি তারই ছিল বলে তারা মনে করছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাজ্যের বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি প্রায় তিন বছর দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পড়াশোনা করে ২০২৩ সালে এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঘটনার পর হামামের এক্স ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে বলে সিএনএন জানিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে হামলার পর দুটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি ভিডিওতে বিভিন্ন উড়োজাহাজের দৃশ্যের পাশাপাশি উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবিও দেখা যায়। অন্য একটি পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ছবি এবং এর সঙ্গে একটি কবিতা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পোস্ট হামাম আল-হাম্মামি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন কি না, কিংবা এগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সিএনএন।
ঘটনার সময় বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের বেশিরভাগই ইসরায়েলি নাগরিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন এবং যাত্রীদের সহায়তায় হামামকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে আহত ক্যাপ্টেনকে চিকিৎসার জন্য এবং হামামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তদন্ত চলছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গাইথ আল গাইথ বলেন, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে হামামের আগের কর্মস্থল ওমান এয়ার এবং ওমান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্লাইদুবাইও জানিয়েছে, তদন্ত চলার সময়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি রয়েছে।
ঘটনার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলগামী সব ফ্লাইট বাতিল করে। এতে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতকারী বহু যাত্রী সমস্যায় পড়েন। পরে ইসরায়েলি বিমান সংস্থাগুলো যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের কর্মকর্তারা ইসরায়েলগামী ফ্লাইট পুনরায় চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল রাখে।
ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ২০২০ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দুবাই ইসরায়েলিদের জন্য একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনার পর বিমান যোগাযোগে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি যাত্রীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।


