নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : ইউরোপের পর্যটন খাত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ভ্রমণকারীদের পছন্দ, প্রযুক্তির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জসবকিছু মিলিয়ে পর্যটনের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনগুলো সামনে রেখে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত হয়েছে Euronews Travel & Tourism Summit 2026।
সম্মেলনে ইউরোপের পর্যটন শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এতে রাজনৈতিক নেতা, নীতিনির্ধারক, পর্যটন বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং ভ্রমণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে উঠে এসেছে, বর্তমান পর্যটন বিশ্ব শুধু বেশি পর্যটক আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। পর্যটকদের অভিজ্ঞতার মান, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং একটি গন্তব্যের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সম্মেলনের আলোচনায় পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অনলাইনে অসংখ্য রিভিউ, অ্যালগরিদম ও ডিজিটাল সুপারিশের ভিড়ে মানবিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি গাইডের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে Michelin Guide।
Michelin Guide-এর হোটেলবিষয়ক কর্মকর্তা Marie-France Perrel জানান, তাদের Michelin Keys নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাস্তব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হোটেলের মান ও ধারাবাহিকতা, স্থাপত্য ও অভ্যন্তরীণ নকশা, ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য, অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সুবিধা এবং স্থানীয় পরিবেশে হোটেলটির অবদান।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। খাবার ও ভ্রমণকে পর্যটকেরা ক্রমেই একই অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখছেন। ২০২৬ সালে হোটেল খোঁজার সময় আশপাশের খাবারের জায়গা সম্পর্কেও পর্যটকদের আগ্রহ বেড়েছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়।
কিরগিজস্তান ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর পরিকল্পনা করছে। দেশটির রাষ্ট্রদূত Aidit Erkin জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে কিরগিজস্তান থেকে ইউরোপে যেতে অনেক যাত্রী ইস্তাম্বুল হয়ে Turkish Airlines-এর ফ্লাইট ব্যবহার করেন। তবে দেশটির অনুমোদিত বিমান সংস্থাগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের Air Safety List থেকে বাদ পড়ার পর সরাসরি বিমান যোগাযোগের পথ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একই আলোচনায় আজারবাইজান ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান Florian Sengstschmid ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে ভ্রমণ বাড়াতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কিরগিজস্তানের পক্ষ থেকে একটি সম্ভাব্য ‘Silk Road visa’-এর কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে এক ভিসায় মধ্য এশিয়ার একাধিক দেশে ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে Expo 2027 আয়োজনকে পর্যটন ও আঞ্চলিক উন্নয়নের বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আয়োজকদের মতে, এই আন্তর্জাতিক আয়োজন শুধু বেলগ্রেড নয়, পুরো পশ্চিম বলকান অঞ্চলের পর্যটন খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
Expo 2027-এর উপদেষ্টা Dušan Borovčanin জানান, এটি ওই অঞ্চলে আয়োজিত প্রথম এমন এক্সপো। ইতোমধ্যে ১৪১টি সরকারি অংশগ্রহণকারী নিশ্চিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আয়োজকদের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সামনে সার্বিয়ার উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে পশ্চিম বলকান অঞ্চলের অন্যান্য গন্তব্যকেও পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান করা।
ক্রোয়েশিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন শহর Dubrovnik অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ মোকাবিলায় নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। শহরের মেয়র Mato Franković জানান, পর্যটকদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও ঐতিহাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষা করাও জরুরি।
২০১৭ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরটি ‘Respect the City’ উদ্যোগ চালু করে। এর মাধ্যমে ক্রুজ জাহাজের আগমন এবং দিনে ও রাতে পর্যটকদের চলাচল আরও পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে।
মেয়রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় শহরটিতে অতিথির সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে তাদের আগমন ও অবস্থান ছড়িয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
ইউরোপের পর্যটন খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যটকদের কম পরিচিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য Daniel Attard বলেন, শুধু পর্যটকদের পরিচিত পথের বাইরে যেতে উৎসাহ দিলেই হবে না; এসব এলাকায় পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে।
সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ উন্নত করা গেলে জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোর ওপর চাপ কমিয়ে নতুন অঞ্চলগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে পর্যটন মৌসুমও পরিবর্তিত হচ্ছে। Airlines for Europe-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক Ourania Georgoutsakou জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনের মূল মৌসুমের বাইরের সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসাগুলো বছরের আরও দীর্ঘ সময় পর্যটকদের সেবা দিতে পারছে।
আজারবাইজান পর্যটকদের শুধু রাজধানী বাকুতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশটির অন্যান্য অঞ্চলে নিয়ে যেতে চায়। দেশটির পর্যটন কর্তৃপক্ষ প্রাচীন সিল্ক রোড, ঐতিহাসিক গ্রাম, ইউনেস্কো স্বীকৃত স্থান এবং পাহাড়ি এলাকার কথা তুলে ধরেছে।
২০২৭ সালের মে থেকে ব্রাসেলস ও বাকুর মধ্যে সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনার কথাও সম্মেলনে জানানো হয়। পর্যটন উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ছোট ব্যবসার কাছেও পৌঁছানো উচিত বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।
রোমানিয়াও পর্যটকদের রাজধানী বুখারেস্টের বাইরে নিয়ে যেতে আগ্রহী। দেশটির পর্যটন কর্তৃপক্ষ গ্রামীণ পর্যটন, স্পা, অ্যাডভেঞ্চার এবং প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কার্পাথিয়ান পর্বতমালার দীর্ঘ হাঁটার পথসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক আকর্ষণকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে।
ক্রুজ পর্যটনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। MSC Cruises-এর CEO Gianni Onorato জানান, আগের তুলনায় তরুণ পর্যটকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। পরিবার, তরুণ পর্যটক, একক ভ্রমণকারী এবং একাধিক প্রজন্মের পরিবার ক্রুজ ভ্রমণের নতুন গ্রাহকগোষ্ঠী হিসেবে সামনে আসছে।
ক্রুজ শিল্পের অর্থনৈতিক অবদানের কথাও তিনি তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় অর্থনীতিতে ক্রুজ খাত বছরে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ইউরো অবদান রাখে এবং প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।
তবে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ কমাতে কম পরিচিত বন্দর ও গন্তব্যে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। পরিবেশগত দিক থেকে পরিষ্কার জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল টেকসই পর্যটন। ইউরোপীয় কমিশনের পর্যটন খাতের প্রতিনিধি Andreea Stăjcu বলেন, পর্যটকেরা এখন আরও টেকসইভাবে ভ্রমণ করতে আগ্রহী। সাইক্লিং ও নাইট ট্রেনের মতো পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদাও আলোচনায় আসে।
সাবেক ক্রোয়েশীয় পর্যটনমন্ত্রী Nikolina Brnjac বলেন, টেকসই পর্যটনকে শুধু পরিবেশের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। সামাজিক, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক—এই তিনটি দিক একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ একটি পর্যটন এলাকায় পর্যটক বাড়লেও স্থানীয় মানুষ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন বা পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য হিসেবে দেখা কঠিন।
ইউরোপের পর্যটন খাতের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। European Travel Commission-এর CEO Eduardo Santander বলেন, অতিরিক্ত তাপ, খরা ও চরম আবহাওয়ার কারণে পরিবহন এবং পর্যটন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অতিরিক্ত তাপের কারণে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হতে পারে। নদীতে পানির স্তর কমে গেলে ক্রুজ চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়। ফলে পর্যটন অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের আবহাওয়াগত ঝুঁকির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরও প্রস্তুত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভ্রমণের ব্যয়ও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দক্ষিণ ইউরোপের গরম অঞ্চল থেকে তুলনামূলক শীতল জায়গায় ভ্রমণের প্রবণতা, অর্থাৎ ‘coolcation’, জনপ্রিয় হচ্ছে।
মধ্য ইউরোপকে আলাদা আলাদা দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি সংযুক্ত পর্যটন অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরার প্রস্তাবও এসেছে। হাঙ্গেরির পর্যটন সংস্থার Olivér Csendes বলেন, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় এক ভ্রমণে একাধিক দেশের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ডানিউব নদীর মতো সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে যৌথভাবে পর্যটনের অংশ করা যেতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, চরম আবহাওয়া এবং পর্যটকের চলাচল ব্যবস্থাপনারক্ষেত্রেও তথ্য আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ বলে আলোচনায় উঠে আসে।
ব্রাসেলসের এই সম্মেলনের আলোচনাগুলো থেকে ইউরোপের পর্যটন খাতের কয়েকটি বড় পরিবর্তনের দিক স্পষ্ট হয়েছে। পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুবিধা, পরিবেশ সুরক্ষা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটকদের মানসম্মত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পর্যটন এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যাও সামনে থাকছে। ফলে ভবিষ্যতের পর্যটন কেবল কতজন মানুষ একটি দেশে গেলেন, সেই সংখ্যায় মাপা হবে না—পর্যটন থেকে স্থানীয় অর্থনীতি, মানুষ ও পরিবেশ কতটা উপকৃত হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Euronews Travel & Tourism Summit 2026-এর আলোচনায় তাই একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে: পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু বেশি ভ্রমণ নয়, বরং আরও পরিকল্পিত, সংযুক্ত, টেকসই এবং অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক ভ্রমণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।


