নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : শিল্প অনেক সময় শুধু সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং একটি সময়ের মানুষের ভয়, ক্ষোভ, আশা ও প্রতিবাদের দলিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) অভিযান ঘিরে সাম্প্রতিক প্রতিবাদে তৈরি হওয়া বিপুলসংখ্যক পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও শিল্পকর্ম এখন সেই ইতিহাসেরই অংশ হয়ে উঠছে।
এই শিল্পকর্মগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন এরিকা হেলান্ডার। তিনি শুরু করেছিলেন একটি ছোট কবিতার বই দিয়ে। পরে সেই উদ্যোগ বিস্তৃত হয়ে তৈরি হয়েছে একটি ২৫০ পৃষ্ঠার হার্ডকভার কফি টেবিল বই। এতে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রায় ৩০০ শিল্পীর কাজ স্থান পেয়েছে।
হেলান্ডারের উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘দ্য রেবেল লুন আর্কাইভ’। আইসিইবিরোধী আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া শিল্পকর্মগুলো যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে হারিয়ে না যায়, সেই লক্ষ্যেই এই আর্কাইভ গড়ে ওঠে।
প্রতিবাদের সময় তৈরি হওয়া পোস্টার ও শিল্পকর্ম সাধারণত দ্রুত মানুষের নজরে আসে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পোস্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো পোস্ট নিচে চলে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিল্পকর্ম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে পারে।
হেলান্ডারের মতে, শুধু অনলাইনে থাকলে কোনো শিল্পকর্ম দীর্ঘদিন মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নেই। তাই তিনি শিল্পীদের কাজ সংগ্রহ করে সেগুলোকে একটি স্থায়ী আর্কাইভে রাখার উদ্যোগ নেন।
তার বাড়ির বসার ও খাবার ঘরে একসময় বিভিন্ন আকারের পোস্টার ও প্ল্যাকার্ডের স্তূপ জমে যায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা এসব শিল্পকর্ম তিনি বড় ব্যাগে করে নিয়ে আসতেন এবং বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করতেন।
‘রেবেল লুন’ নামটি এসেছে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের প্রতীকী পাখি লুনকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি শিল্পচিত্র থেকে। মুরহেডের এক শিল্পীর তৈরি ডানা মেলে থাকা লুনের সেই ছবি দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি টি-শার্ট, প্রতিবাদের পোস্টার এমনকি ট্যাটুতেও দেখা যায়। একটি শিল্পকর্ম কীভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হতে পারে, হেলান্ডার সেখানে তার শক্তি দেখতে পান।
তবে নিজে ছবি আঁকার চেয়ে লেখালেখির মাধ্যমেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। পেশায় গয়না নির্মাতা এবং লেখালেখির অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। আইসিই অভিযান ঘিরে পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন চার বছর বয়সী সন্তান ও এক নবজাতককে নিয়ে বাড়িতে থাকা হেলান্ডার নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করতে কবিতার আশ্রয় নেন।
হেলান্ডার প্রথমে নিজের কবিতাগুলো নিয়ে একটি ছোট বই তৈরি করেন। সেটি ছিল মাত্র ৩০ পৃষ্ঠার একটি স্ট্যাপল করা বুকলেট। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, ব্যক্তিগত কবিতার এই উদ্যোগ আরও বড় একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দলিল তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এরপর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-মেইলের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। শিল্পীদের কাজ আর্কাইভ ও বইয়ে প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হয়। শিল্পীরা যেন ভবিষ্যতেও নিজেদের কাজ অন্য জায়গায় প্রকাশ করতে পারেন, সেই বিষয়টিও চুক্তিতে রাখা হয়।
এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত একটি ৮ দশমিক ৫ বাই ১১ ইঞ্চি আকারের, ২৫০ পৃষ্ঠার হার্ডকভার কফি টেবিল বইয়ে রূপ নেয়।
বইটিতে প্রায় ৩০০ শিল্পীর কাজ রয়েছে। এতে শুধু পরিচিত বা বেশি অনুসারী থাকা শিল্পীদের কাজ নয়, বরং বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হেলান্ডারের কাছে এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিল্পীর জনপ্রিয়তা নয়। কোনো শিল্পীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত অনুসারী রয়েছে, সেটিকে তিনি নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখেননি।
বরং মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের স্বাধীনতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইসিই অভিযান ও তা ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক পরিস্থিতি মানুষের জীবনে যে ভয়, দুঃখ, ক্ষোভ, ভালোবাসা ও আশার জন্ম দিয়েছে, শিল্পীরা সেই অনুভূতিগুলো নিজেদের মতো করে প্রকাশ করেছেন।
হেলান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শিল্পকর্ম সংগ্রহ করা তার কাছে সম্মানের বিষয়। কারণ শিল্পীরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে সেগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
বইটির শিল্পকর্মগুলো নয়টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো সময়ক্রম এবং বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে।
প্রতিটি অংশের শুরুতে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর একজন বিশেষজ্ঞের লেখা প্রবন্ধ। এর ফলে পাঠক শুধু একটি পোস্টার বা ছবি দেখবেন না, বরং সেটি কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল, সেটিও বুঝতে পারবেন।
আর্কাইভের উদ্দেশ্য তাই কেবল ছবি সংরক্ষণ করা নয়। প্রতিটি শিল্পকর্মের পেছনের গল্প ও সময়ের প্রেক্ষাপটও ধরে রাখা।
বই প্রকাশের জন্য জুন মাসে অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। হেলান্ডার যতটা সাড়া আশা করেছিলেন, তার চেয়ে দ্রুত বেশি মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়।
প্রথম বিক্রয়পর্বের পর তাকে দ্বিতীয়বার অনলাইনে অর্ডারের সুযোগ খুলতে হয়। সেখানেও প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সাড়া আসে।
প্রকাশের আগে ১ হাজার ২২৫টির বেশি মুদ্রিত বই এবং ৫৯টি ই-বুকের অর্ডার পাওয়া যায়। বই বিক্রি থেকে পাওয়া নিট অর্থের একটি অংশ ইমিগ্র্যান্ট ডিফেন্স নেটওয়ার্ককে সহায়তা করবে।
বইয়ে অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিল্পীও একটি করে কপি পাবেন।
বইটির প্রতি আগ্রহ শুধু সাধারণ পাঠকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষাবিদ ও লাইব্রেরিগুলো থেকেও হেলান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কাছে বইটি কীভাবে পৌঁছানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এর ফলে একটি প্রতিবাদী শিল্পসংগ্রহ ভবিষ্যতে শিক্ষামূলক ও গবেষণামূলক উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
শুধু বই প্রকাশ করেই থেমে থাকতে চান না হেলান্ডার। রেবেল লুন আর্কাইভ সংগ্রহ করা পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও অন্যান্য শিল্পকর্ম ডিজিটাল করার কাজও করছে।
লক্ষ্য হলো এসব শিল্পকর্ম অনলাইনে এমনভাবে সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যতে মানুষ সহজেই সেগুলো দেখতে ও গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারে।
মিনেসোটা ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য জায়গায় ইতোমধ্যে এসব পোস্টার প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। ফলে রাস্তায় তৈরি হওয়া প্রতিবাদের শিল্প ধীরে ধীরে গ্যালারি ও আর্কাইভের অংশ হয়ে উঠছে।
প্রতিবাদের সময় তৈরি শিল্প অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রতিবেদন বা সরকারি নথির বাইরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। একটি পোস্টারে হয়তো একজন মানুষের ভয় প্রকাশ পায়, অন্যটিতে দেখা যায় ক্ষোভ, আবার কোনো শিল্পকর্মে থাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার বার্তা।
এই কারণেই হেলান্ডার মনে করেন, শিল্প সংরক্ষণ মানে শুধু কাগজ বা ছবি সংরক্ষণ করা নয়। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের কণ্ঠও সংরক্ষিত হয়।
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে সাধারণত বড় ঘটনা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি বক্তব্য বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু রাস্তার পোস্টার, দেয়ালের চিত্র কিংবা হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড সেই সময়ের সাধারণ মানুষের অনুভূতিও ধরে রাখতে পারে।
আইসিইবিরোধী প্রতিবাদের শিল্পকর্ম নিয়ে বই প্রকাশের পরও রেবেল লুন আর্কাইভের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। হেলান্ডার জানিয়েছেন, তাদের পরবর্তী প্রকল্প হবে বাউন্ডারি ওয়াটারস ক্যানো অ্যান্ড ওয়াইল্ডারনেসকে ঘিরে।
অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ এখন বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের দিকে এগোচ্ছে।
হেলান্ডারের কাছে শিল্প শুধু একটি সৃজনশীল কাজ নয়। এটি মানুষের কথা বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
তার মতে, শিল্প মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, কঠিন সময়ের মধ্যে মানুষকে মানসিকভাবে শক্তি দিতে পারে এবং এমন সত্য প্রকাশ করতে পারে, যা ক্ষমতাবানদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।



