নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজ বাংলা : বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে চীনের আরও সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বঙ্গভবনে বিদায়ী সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) এ তথ্য জানিয়েছেন। সাক্ষাতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক যোগাযোগ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে চীনের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট। এই পরিস্থিতিতে সংকটের স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে চীনের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। বিশেষ করে সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতে চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় তৈরি পোশাক, বৈদ্যুতিক যানবাহন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর এবং সৌরশক্তির মতো খাতের কথা উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, এসব খাতে চীনা প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্প খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও এ ধরনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সাক্ষাতে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতি কুনমিং-চট্টগ্রাম করিডর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক যোগাযোগ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ চীন ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে পণ্য পরিবহন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রপতি মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগকে বাংলাদেশের যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বন্দর সক্ষমতা বাড়লে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। শিল্পাঞ্চলটি বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে এ প্রকল্পের নানা দিক জড়িত। ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক জোরদারে ইয়াও ওয়েনের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার।
রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের চীন সফরের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর নিজের সফর এবং বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থীদের চীন সফরের কথাও তুলে ধরেন।
তার মতে, এসব সফর ও পারস্পরিক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করেছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য খাতে চীনের সহযোগিতার কথাও বৈঠকে উঠে আসে। এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ ও অর্থায়নের জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়নে বড় হাসপাতাল ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সহযোগিতায় এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে জনগণের জন্য উন্মুক্ত জটিল ব্লাড ক্যান্সার চিকিৎসায় চীনা দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
জবাবে চীনের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াও ওয়েনের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
বিদায়ী রাষ্ট্রদূতও দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাক্ষাতের সময় রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য গন সচিব উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে ছিলেন দেশটির ডেপুটি চিফ অব মিশন ড. লিই ইউইন।
বৈঠকে অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, আঞ্চলিক যোগাযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।



