নিউজ বাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু মামলার শুনানি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তেল ও জ্বালানি খাতের কয়েকটি কোম্পানিতে তাঁর শেয়ার বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এই সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। মামলাটি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ সংক্রান্ত।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি ওঠার ঠিক আগে আলিটোর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে বিচারপতিদের স্বার্থের সংঘাত এবং আদালতের নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত একটি চিঠিতে জানানো হয়েছে, বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো এই মামলায় আর অংশ নেবেন না। তবে চিঠিতে তাঁর সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগেও এমন কিছু মামলায় আলিটো নিজেকে প্রত্যাহার করেছিলেন, যেখানে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের মালিকানা তাঁর ছিল। ফলে এবারের সিদ্ধান্তও তাঁর বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মামলাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর বোল্ডার এলাকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়ের করা অভিযোগ। মামলায় তেল ও জ্বালানি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান সানকর এনার্জি ও এক্সনমোবিলকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তেল ও গ্যাস শিল্পের কার্যক্রমের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তথ্য ও প্রচারণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করা হয়েছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রে চলমান এমন বহু মামলার মধ্যে একটি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এনে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
এই মামলাগুলোর আর্থিক গুরুত্বও অনেক। আদালতে বাদীপক্ষের দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের দায় আসতে পারে।
সানকর এনার্জি ও এক্সনমোবিল মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করে। পরে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সেই আপিল শুনতে সম্মতি দেয়।
কোম্পানিগুলোর অবস্থান হলো, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এ ধরনের জটিল আন্তর্জাতিক ও পরিবেশগত বিষয়কে স্থানীয় বা অঙ্গরাজ্যের আদালতে বিচার করা উপযুক্ত নয় বলে তারা মনে করে।
জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মতে, এই ধরনের মামলা পুরো জ্বালানি শিল্পের জন্য বড় ধরনের আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন যদি পৃথকভাবে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে থাকে, তাহলে শিল্পটির ওপর ব্যাপক আর্থিক ও আইনি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে কোম্পানিগুলো যুক্তি দিয়েছে।
মামলাটির সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সমর্থনও পেয়েছে।
এতে মামলাটির রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ জলবায়ু নীতি, জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পরিবেশগত দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
তবে আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং এ ধরনের মামলা কোন আদালতে এবং কোন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, বিচারপতি আলিটোর নিজের নামে সানকর এনার্জি বা এক্সনমোবিলের শেয়ার নেই। তবে তাঁর আর্থিক ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, তিনি অন্য কয়েকটি তেল কোম্পানিতে বিনিয়োগ রেখেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে কনোকোফিলিপস এবং ফিলিপস ৬৬-এর মতো জ্বালানি প্রতিষ্ঠান। এই বিনিয়োগের কারণে মামলার ফলাফলের সঙ্গে তাঁর আর্থিক স্বার্থের কোনো পরোক্ষ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ভোক্তা অধিকারকেন্দ্রিক সংগঠন কনজিউমার ওয়াচডগ।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের নৈতিকতা সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী বিচারপতি বা তাঁর পরিবারের আর্থিক স্বার্থ যদি মামলার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে বিচারপতির সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কনজিউমার ওয়াচডগের সংগঠক আলেকজান্দ্রা নাগি আলিটোর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলিটোর সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক চিঠিতে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত সরাসরি তেল কোম্পানির শেয়ার মালিকানার কারণে হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও আদালতের প্রক্রিয়াকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
আলিটো মামলার শুনানি থেকে সরে দাঁড়ানোয় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে তাঁর অংশগ্রহণ আর থাকবে না। এখন আদালত মামলাটির আইনি প্রশ্নগুলো কীভাবে বিবেচনা করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এই মামলার রায় যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের অনেক মামলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বা অঙ্গরাজ্যগুলোর দায়ের করা মামলাগুলো কোন আদালতে চলবে এবং কী ধরনের আইনি দাবি গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, মামলাটি শুধু পরিবেশগত ক্ষতি বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারপতিদের আর্থিক স্বার্থ, বিচারিক নৈতিকতা এবং স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে জলবায়ু সংক্রান্ত মামলা নতুন নয়। বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসন ও অঙ্গরাজ্য দাবি করে আসছে, তেল ও গ্যাস শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি।
অন্যদিকে কোম্পানিগুলো সাধারণত এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান নেয় এবং বলে, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যার দায় নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যায় না।



