ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় গেলেই এখন একটা প্রশ্ন প্রায় সবার মুখে—“ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষটা কোথায়?” নামটা শুনেই কৌতূহল লাগে, তাই না? দেখতে অনেকটা সাদা-গোলাপি রঙের এই মহিষটাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত জনপ্রিয়তা। কেউ হাসছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার বলছে—চেহারায় নাকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিল আছে!
কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—এই মহিষটা কি সত্যিই কোনো বিরল প্রজাতি? নাকি বিষয়টা একটু অন্যরকম?
ঈদের সময় থেকেই এই মহিষটি আলোচনায় আসে। কোরবানির পশুর বাজারে যখন মানুষ ভিড় করছে, তখন হঠাৎই চোখে পড়ে এই অদ্ভুত রঙের মহিষ। সাধারণত আমরা কালো বা ধূসর রঙের মহিষ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই সাদা-গোলাপি রঙ যেন সবাইকে চমকে দেয়।
ঈদের আগের দিন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়—এটিকে কোরবানি না দিয়ে সংরক্ষণ করা হবে। এরপর জায়গা হয় জাতীয় চিড়িয়াখানায়। আর ব্যস! সেখান থেকেই শুরু আসল জনপ্রিয়তা।
চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখা যায়, অন্য প্রাণীর চেয়ে এই মহিষের খাঁচার সামনে ভিড় বেশি। অনেকেই নাম ধরে ডাকছে—“ডোনাল্ড ট্রাম্প!” কেউ হাসছে, কেউ ভিডিও করছে। যেন একটা প্রাণী নয়, একেবারে তারকা!
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে—“অ্যালবিনো” মানে কিন্তু কোনো আলাদা জাত নয়।
ধরো, একটা মানুষের চুল হঠাৎ করে খুব ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, বা চোখের রঙ অদ্ভুত হয়ে গেলো। এটা যেমন কোনো আলাদা জাত না, বরং শরীরের ভেতরের পরিবর্তন—ঠিক তেমনি।
অ্যালবিনো হচ্ছে এমন একটা অবস্থা, যেখানে প্রাণীর শরীরে মেলানিন নামের রঙ তৈরি করার উপাদানটা ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে গায়ের রঙ সাদা বা হালকা গোলাপি হয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তন পুরোপুরি জিনগত। সহজভাবে বললে, মা-বাবা দুজনের কাছ থেকেই যদি নির্দিষ্ট ধরনের জিন আসে, তখন এই অ্যালবিনিজম দেখা দিতে পারে।
এই কারণে এটাকে “জেনেটিক ডিজঅর্ডার” বা বৈশিষ্ট্য বলা হয়। এটা শুধু মহিষেই না—সাপ, পাখি, ইঁদুর এমনকি কিছু সরীসৃপ প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়।
মানে ব্যাপারটা এমন—এটা কোনো নতুন প্রজাতি না, বরং প্রকৃতির একটু ভিন্ন রূপ।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—এই মহিষ কি বিরল?
উত্তরটা একটু মিশ্র।
বাংলাদেশে এই ধরনের অ্যালবিনো মহিষ খুব বেশি দেখা যায় না। তাই আমাদের চোখে এটা বিরল মনে হয়। বিশেষ করে পুরো সাদা বা গোলাপি রঙের মহিষ তো আরও কম।
তবে বিশ্বের অন্যান্য জায়গা—যেমন ভারত, চীন বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এই ধরনের মহিষ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
মানে, একেবারে অদ্ভুত বা একটাই আছে—এমন না। কিন্তু খুব সাধারণও না।
জানা গেছে, এই মহিষটি নারায়ণগঞ্জের একটি খামার থেকে কেনা হয়েছিল। সেখানে একই ধরনের আরও কয়েকটি অ্যালবিনো মহিষ ছিল।
মজার বিষয় হলো—ঈদের আগেই সবগুলো মহিষ বিক্রি হয়ে যায়। অর্থাৎ, শুধু এই একটি নয়—এমন আরও ছিল।
তবে এগুলোর আসল উৎস কোথায়, সেটা স্পষ্ট জানা যায়নি। অনেক সময় খামারিরা বিদেশ থেকে এনে থাকে।
অনেকেই ভাবছেন—শুধু দেখানোর জন্যই কি এটাকে চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে?
আসলে বিষয়টা একটু গভীর।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, এটাকে মূলত গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে। তারা দেখতে চায়—
এই অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায় কি না
মহিষের নতুন কোনো উন্নত জাত তৈরি করা সম্ভব কি না
দুগ্ধ উৎপাদনে এর কোনো বিশেষ ভূমিকা আছে কি না
মানে, বিষয়টা শুধু “দেখে মজা পাওয়া” না—এখানে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও আছে।
তুমি জানো কি, অনেক দেশে গরুর চেয়ে মহিষের দুধ বেশি জনপ্রিয়?
কারণ মহিষের দুধে ফ্যাট আর প্রোটিন বেশি থাকে। ফলে দুধটা ঘন হয়, আর পুষ্টিগুণও বেশি।
এই কারণে যদি গবেষণার মাধ্যমে ভালো বৈশিষ্ট্যের মহিষ তৈরি করা যায়, তাহলে দেশের দুগ্ধশিল্পে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
চিড়িয়াখানায় যারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই এই মহিষটা দেখতে যাচ্ছে বিশেষ করে।
কেউ বলছে—“ফেসবুকে দেখে এসেছি”
কেউ বলছে—“চেহারা নাকি ট্রাম্পের মতো!”
আসলে মানুষ নতুন কিছু দেখতে ভালোবাসে। আর এই মহিষটা সেই “নতুনত্ব”টাই এনে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে ভাইরাল এই মহিষটা আমাদের জন্য একদিকে যেমন বিনোদন, অন্যদিকে তেমনি শেখার একটা সুযোগ।
এটা কোনো আলাদা জাত নয়, বরং জিনগত পরিবর্তনের ফল। তবে আমাদের দেশে বিরল হওয়ায় এটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
একভাবে দেখলে, এটা প্রকৃতির ছোট্ট একটা চমক। আর সেই চমকই আজ হাজার মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র।
তাই পরেরবার চিড়িয়াখানায় গেলে, শুধু ছবি তুলে চলে এসো না—একটু ভেবে দেখো, এই অদ্ভুত রঙের পেছনে কত বড় বৈজ্ঞানিক গল্প লুকিয়ে আছে!
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

