নিজস্ব প্রতিবেদক,নিউজবাংলা : রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণ বা সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটিয়ে সরকারের ওপর বড় ধরনের সংকট তৈরি করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দাম, সরকারের ভর্তুকি নীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ উঠে এলে জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের ওপর বড় ধরনের সংকট তৈরি করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, রাজধানীতে দু-একটি ককটেল বিস্ফোরণ বা বাসে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলেও সেটিকে কেন্দ্র করে সরকারকে বড় ধরনের সংকটে ফেলা যাবে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সংকট তৈরির ক্ষেত্রে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা কার্যকর নয়।
এর আগে সাম্প্রতিক সহিংসতার বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে নানা বক্তব্য এলেও তথ্য উপদেষ্টা ব্রিফিংয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এবং সরকারের মেয়াদ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সেই বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করা উচিত।
ব্রিফিংয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামার মধ্যে দেশে দাম বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ অস্থির বা ‘ভোলাটাইল’।
তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকারকে ভর্তুকির বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষে কতটা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব, সেই বিষয়টি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেখতে হচ্ছে।
তিনি জানান, ডিজেলে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছিল এবং সেই লোকসান কমানোর চেষ্টা করছে সরকার। তবে একই সঙ্গে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের কোনো শর্ত নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন। মঙ্গলবারের ব্রিফিংসংক্রান্ত একাধিক প্রতিবেদনে এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে চায়।
তিনি বলেন, জনগণের কষ্ট বাড়িয়ে সরকার কোনো সংকট তৈরি করতে চায় না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় ভর্তুকির বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে।
জাহেদ উর রহমান তার বক্তব্যে আগের সরকারের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সময় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি পদত্যাগের দাবি জানাতেন, কারণ তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখনকার সরকার নির্বাচিত ছিল না। তবে বর্তমান সরকারকে তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হতে পারে, তবে সরকার একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষের পাশে থাকার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি জানান, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সফরের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা এবং কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর দেশের উদ্দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে প্রকাশিত অন্যান্য প্রতিবেদনেও ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার ভাষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, সফরের একটি অংশে সানফ্রান্সিসকোতে দলীয় বা অন্য কোনো কর্মসূচি থাকার কথা ছিল। তবে দেশের বর্তমান সংকট ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করে সফরটি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। সেখানে দলীয় কিংবা অন্য কোনো কর্মসূচি হতে পারত। পরে সেটি বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, কম সময়ের সফর হলে সরকারি ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় সাশ্রয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই সফর সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্ষিপ্ত করার আরেকটি কারণ হিসেবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতিও সরকারের নজর রয়েছে। সে কারণে বিদেশ সফরের কর্মসূচি প্রয়োজন অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ ও মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন।
জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনবে এটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত তথ্য। ফলে সফরের সময় এ বিষয়ে চুক্তি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তার কাছে এর চেয়ে বেশি নিশ্চিত তথ্য নেই বলে জানান তিনি।
সরকারিভাবে তিনি যতটুকু তথ্য পেয়েছেন, সেটুকুই সাংবাদিকদের জানানোর কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। অর্থাৎ বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির সম্ভাবনার কথা থাকলেও চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা তিনি দেননি।
মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি তেলের মূল্য, সরকারি ভর্তুকি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর সবগুলো বিষয়ই উঠে আসে।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং অন্যদিকে দেশের মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব দুই দিক বিবেচনার কথা তিনি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে রাজধানীতে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বা ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাকে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছে না সরকার এমন বার্তাও দেন তিনি।



