সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeজাতীয়জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার চাপ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার চাপ

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে নতুন করে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজবাংলা : ঢাকার আজিমপুরের বাসিন্দা মো. আলী হোসেনের জীবনে গত কয়েক বছরে একের পর এক পরিবর্তন এসেছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। করোনা মহামারির সময় চাকরি হারানোর পর পরিবারের খরচ চালাতে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং শুরু করেন।

এখন সেই আয় দিয়েই স্ত্রী ও সন্তানসহ চার সদস্যের সংসার চালাতে হয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

আলী হোসেনের ভাষায়, যাত্রী আগের তুলনায় কমে গেছে। তার ওপর তেলের খরচ বেড়েছে। ফলে প্রতিদিনের আয় থেকে সংসারের জন্য হাতে কতটা থাকবে, সেটিই এখন বড় চিন্তার বিষয়।

তাঁর মতো পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ ভোক্তা, কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যেও।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে।

এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ একবারে সব ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা করে বেড়েছে।

চলতি বছরে এটি জ্বালানি তেলের তৃতীয় দফা বড় মূল্যবৃদ্ধি। এপ্রিলেও ডিজেলের দাম ১৫ টাকা এবং পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম যথাক্রমে ১৯, ২০ ও ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরে জুনে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশের বাজারে আগের দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান দ্রুত বাড়ছিল।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

বিপিসির চেয়ারম্যানও জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভর্তুকি ও লোকসানের চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সরকারের আরেকটি উদ্বেগ হলো সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কম থাকলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সরকারি বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানি তেল শুধু গাড়ি চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান প্রয়োজন। কৃষিতে সেচের কাজে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়েও জ্বালানি প্রয়োজন হয়।

ফলে তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা আসে পরিবহন খাতে। এরপর সেই বাড়তি পরিবহন ব্যয় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের খরচে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে বাজারদরেও।

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। এর মধ্যে পরিবহন সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী খাত; কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পেও ডিজেলের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। জমিতে সেচ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনার খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বাজারদরে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে চাল, ডাল, সবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের দামে চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম ঠিক কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন, আমদানি ব্যয় এবং বাজার পরিস্থিতিসহ একাধিক বিষয়ের ওপর।

বাংলাদেশের শিল্পখাতও জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাইরে নয়। কারখানায় উৎপাদনের পাশাপাশি কাঁচামাল আনা এবং তৈরি পণ্য বাজারে পৌঁছে দিতে পরিবহন প্রয়োজন।

জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহের মোট খরচ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্পে পরিবহন ও জ্বালানির ব্যবহার বেশি, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদন খরচ বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পসহ রপ্তানি খাতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায়।

বাস মালিকদের পরিচালন ব্যয় বাড়লে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি উঠতে পারে। একইভাবে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে—এমন সরল হিসাব করা যায় না। বাজারে প্রতিযোগিতা, পরিবহন দূরত্ব, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পণ্যের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে নতুন করে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব যদি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সাধারণ মানুষের প্রধান প্রশ্ন হলো আয় বাড়বে কি না।

একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর মাসিক বেতন একই থাকলেও যদি বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় বাড়ে, তাহলে মাস শেষে সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়।

রাইড শেয়ারিং চালক, ট্রাকচালক, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও সরাসরি হতে পারে।

একজন ট্রাকচালকের ক্ষোভের সারকথা তাই অনেক মানুষের প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায় জ্বালানি, গ্যাস ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর পরিবারের খাবারের জন্য হাতে কত টাকা থাকবে?

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২২ সালেও। সে সময় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছিল।

সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে দুই সময়ের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। তাই আগের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের মূল্যস্ফীতির হার সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে বিপিসির লোকসানের চাপ কমানোর পাশাপাশি বাজারে এর দ্বিতীয় দফার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকার জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর গণপরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ