সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদট্রাম্পের হুমকির পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্কের চুক্তি

ট্রাম্পের হুমকির পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্কের চুক্তি

চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার স্থায়ী অধিকার থাকবে। তিনি আরও দাবি করেছেন, এই ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা কোনো খরচ হবে না।

নিউজবাংলা, আন্তর্জাতিক ডেক্স : গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কয়েক মাসের কূটনৈতিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চুক্তিটির ঘোষণা দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এর সব শর্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটি নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, চুক্তিটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং একই সঙ্গে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে।

চুক্তির ঘোষণাটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল। ট্রাম্প এর আগে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান ও খনিজ সম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।

নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই বিরোধের একটি কূটনৈতিক সমাধানের কাঠামো তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ও কিছু সংবেদনশীল বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করবে।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে বলেছেন, চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার স্থায়ী অধিকার থাকবে। তিনি আরও দাবি করেছেন, এই ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা কোনো খরচ হবে না।

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারবে বলেও মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে। তবে এর বাস্তব রূপ, কতসংখ্যক সেনা বা কী ধরনের অবকাঠামো তৈরি হবে এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সরকারি নথি প্রকাশ করা হয়নি।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন চুক্তিটিকে আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের যৌথ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে।

চুক্তিটি কার্যকর করতে ডেনমার্কের সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে চুক্তিতে স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে ডেনমার্ক জানিয়েছে।

অর্থাৎ, চুক্তির ঘোষণা হলেও এটিকে পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও কিছু আনুষ্ঠানিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সমঝোতা গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান ও স্বার্থকে স্বীকৃতি দেয়।

গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তাই নতুন চুক্তিতে নিরাপত্তার বিষয়টির পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অধিকার আরও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি পেতে পারে। এর মধ্যে স্থায়ী প্রবেশাধিকার, সামরিক ঘাঁটি এবং আকাশপথ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলেও চুক্তির কার্যকারিতা শেষ হবে না। তবে এই ব্যবস্থার আইনি ও রাজনৈতিক প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের পর আরও পরিষ্কার হতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো আর্কটিক অঞ্চলে এর অবস্থান। রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে দ্বীপটির নিরাপত্তাকে ওয়াশিংটন বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি কিছু সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগের ওপরও বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে কোন কোন খাতকে ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং বিনিয়োগ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কী হবে, তা বিস্তারিত নথি প্রকাশের পর বোঝা যাবে।

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৫১ সালের ডেনমার্ক-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনেই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সুযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যবস্থায় পরিবর্তনও আনা হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান চুক্তিটি সেই পুরোনো ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক অধিকারকে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত করার দিকে যাচ্ছে। তবে নতুন চুক্তিটি ১৯৫১ সালের ব্যবস্থার তুলনায় ঠিক কতটা পরিবর্তন আনছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এটি আর্কটিক অঞ্চলে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে। নতুন চুক্তির ফলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে বলে মার্কিন পক্ষের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদও আন্তর্জাতিক আগ্রহের একটি বড় কারণ। দ্বীপটিতে বিভিন্ন ধরনের বিরল খনিজের মজুত রয়েছে। এসব খনিজ আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অন্যান্য শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আর্কটিক অঞ্চলে জলবায়ু ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অঞ্চলটির কৌশলগত মূল্য শুধু সামরিক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগের বক্তব্যই যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছিল। তিনি দ্বীপটি কেনার আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

কখনো কখনো সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। এসব বক্তব্য ডেনমার্কসহ ইউরোপের ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। চলতি মাসেও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা প্রকাশ করেছিলেন।

নতুন চুক্তি সেই উত্তেজনা কমানোর একটি পথ তৈরি করেছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি না, তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তিটির সম্পূর্ণ সরকারি নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও সব শর্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ এখনো সীমিত।

চুক্তি স্বাক্ষর এবং প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে এর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অধিকার, গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলে চুক্তির অবস্থান এসব বিষয় তখন আরও স্পষ্ট হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ