নিউজবাংলা ডেক্স, ১৮ সেপ্টেম্বর : বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এসব চুক্তি খতিয়ে দেখছে এমন খবরের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ভারত।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভারতকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ভারতের নজরে এসেছে।
চুক্তি পর্যালোচনার এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দুই দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি বণ্টন ও অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে অতীতে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত বা বিষয় রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চিফ হুইপের বক্তব্যের পর থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পায়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকায় পর্যালোচনার উদ্যোগকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেই সেগুলো বাতিল করা হবে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানানো হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট চুক্তির বিষয়বস্তু, শর্ত এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে এর সম্পর্ক যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে উঠে এসেছে।
শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়টি ওঠে। এএনআইয়ের সাংবাদিক জানতে চান, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা দিয়েছে কি না।
জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, তাঁরা এ বিষয়ে কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখেছেন। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ভারত নিজের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ভারতের এই বক্তব্যে চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মুখপাত্রের বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বাতিল, পরিবর্তন বা নতুন আলোচনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যও সামনে এসেছে। তিনি জানান, এসব স্মারক ও চুক্তি জাতীয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর অর্থ হলো, চুক্তিগুলোর বিষয়বস্তু ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো শর্ত সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার বিষয় থাকতে পারে। যেমন বাণিজ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। তবে ১০১টি চুক্তির প্রতিটির নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ও শর্ত প্রকাশ্যে না থাকায় সব চুক্তি সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহু বছর ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সড়ক ও রেলপথ, নৌপথ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সহযোগিতা রয়েছে।
এসব সহযোগিতার পেছনে বিভিন্ন সময়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক ভূমিকা রেখেছে। ফলে পুরোনো চুক্তিগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগকে শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো প্রেক্ষাপট বোঝা যাবে না।
চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে কোনো দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে কি না এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে শর্তগুলো কার্যকর রয়েছে কি না—এসব প্রশ্ন খতিয়ে দেখা হতে পারে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে চুক্তিগুলো যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে অবস্থান জানিয়েছে। এ কারণে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে আলোচনার সময়সূচি বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার খবর প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এসব চুক্তি কি বাতিল করা হবে, নাকি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, চুক্তিগুলো যাচাই করে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কোন চুক্তিতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অধিকার, দায়িত্ব ও নির্ধারিত শর্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই কোনো চুক্তি পরিবর্তন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনগত ও কূটনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশের পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে কোনো বক্তব্য আসে কি না, তা পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন। শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালকে পানি বণ্টন ও দুই দেশের যৌথ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
তিনি জানান, পানি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসি ব্যবস্থা রয়েছে। কারিগরি পর্যায়েও বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পানি বণ্টন নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা, অন্যদিকে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের সামগ্রিক পর্যালোচনা।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তিগুলো যাচাই করার কথা জানানো হয়েছে। ভারতও আনুষ্ঠানিক বার্তা না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
এখন মূল বিষয় হলো, পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশ সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো চুক্তিতে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে কি না এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।



