নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজবাংলা, ১৭ সেপ্টেম্বর : রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি লেকের দূষণ রোধে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। লেকগুলোর পরিবেশগত উন্নয়ন, পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ এ তথ্য জানান।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ লেকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দূষণের উৎস, সংস্কার পরিকল্পনা এবং পরিবেশ রক্ষায় করণীয় নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে ধানমন্ডি লেকের সংস্কার, তলদেশে জমে থাকা স্লাজ অপসারণ ও পাইলট প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে গুলশান লেকের দূষণের উৎস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। জানানো হয়, লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের উৎস ও মাধ্যম হিসেবে ছয়টি প্রাইমারি এবং ছয়টি সেকেন্ডারি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মোট ১২টি পয়েন্ট দিয়ে দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য লেকে প্রবেশ করছে।
লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে গঠিত কারিগরি কমিটি এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করে।
শুধু লেক পরিষ্কার করলেই দূষণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। যেসব পথ দিয়ে বর্জ্য ও নোংরা পানি লেকে প্রবেশ করছে, সেগুলো শনাক্ত করে বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বৈঠকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ভবনভিত্তিক এসটিপি স্থাপন এবং বিদ্যমান স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত জরিপের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে লেকের পানিতে দূষিত বর্জ্য প্রবেশ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা লেক দূষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই নির্ধারিত ভবনগুলোতে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।
ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী প্রযোজ্য ভবনগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসটিপি স্থাপন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এসটিপি বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে দূষণ কমানোর চেষ্টা করা হয়। ভবনভিত্তিক এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ড্রেন বা লেকে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
তবে শুধু প্ল্যান্ট স্থাপন করলেই হবে না। সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিও প্রয়োজন।
রাজধানীর অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন বৃষ্টির পানির ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব সংযোগের মাধ্যমে দূষিত পানি লেক বা জলাধারে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই সমস্যা সমাধানে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি বৃষ্টির পানির ড্রেন বা লেকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত হলে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে গুলশান-বনানী এলাকায় শর্তসাপেক্ষে স্যুয়ারেজ বিল আদায়ের বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ক্যাচমেন্ট এরিয়া তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
ক্যাচমেন্ট এরিয়া বলতে এমন একটি এলাকা বোঝায়, যেখান থেকে বৃষ্টির পানি বা অন্যান্য পানি নির্দিষ্ট জলাধার, খাল বা নিষ্কাশন ব্যবস্থায় গিয়ে জমা হয়। সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকলে জলাবদ্ধতা কমানো এবং লেকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
রাজধানীর লেকগুলোতে ভাসমান বর্জ্য অপসারণের জন্য বর্তমানে ব্যবহৃত যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে ভাসমান বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ১০টিতে উন্নীত করার কথা বলা হয়।
এর ফলে লেকের পানিতে ভাসমান প্লাস্টিক, পলিথিন, আবর্জনা ও অন্যান্য বর্জ্য নিয়মিত অপসারণের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে।
লেকের পানির ওপর ভাসমান বর্জ্য ছাড়াও তলদেশে জমে থাকা স্লাজ বা পলি দূষণের অন্যতম সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ভাসমান এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে লেকের তলদেশে জমে থাকা স্লাজ অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং তলদেশের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে লেকের পরিবেশ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে পানির গুণমান, জলজ পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি।
রাজধানীর ধানমন্ডি লেকের সংস্কার কার্যক্রমও বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচালিত ধানমন্ডি লেকের সংস্কার, স্লাজ অপসারণ ও পাইলট প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
ধানমন্ডি লেক রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর জলাধার। এ ধরনের জলাধার শহরের পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন ও জনসাধারণের বিনোদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই লেকের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৈঠকে ধানমন্ডি লেকের চলমান কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
লেকের পানির গুণমান উন্নয়নে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানোর যন্ত্র বা এরেটর স্থাপনের প্রস্তাবও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
এরেটর পানিতে অক্সিজেন মিশ্রণে সহায়তা করে। জলাশয়ের পানিতে পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকলে জলজ পরিবেশের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে লেকের দূষণের মূল উৎস বন্ধ না করে শুধু এরেটর স্থাপন করলে দূষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
এ কারণে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, বর্জ্য অপসারণ এবং পানির গুণমান পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এ ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্যোগ সমন্বয় করে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
লেকের পানিতে দূষণের কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হলে তা আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে। এ সমস্যা মোকাবিলায় জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজধানীর লেকগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণে রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ইতোমধ্যে পাঁচটি বিশেষ টিম নিয়োজিত করা হয়েছে। এসব টিমে মোট ৪২ জন জনবল রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
লেকের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে এসব টিম কাজ করবে।
তবে লেকের পরিবেশগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু পরিচ্ছন্নতা টিম থাকলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি, নিয়মিত তদারকি এবং কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর লেকগুলো রক্ষায় একাধিক সরকারি সংস্থা কাজ করে। ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
একটি সংস্থা যদি বর্জ্য অপসারণ করে, অন্য সংস্থা যদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিচালনা করে, তাহলে দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ না থাকলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা থেকে যেতে পারে।
তাই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেকের দূষণ রোধে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


