আইপিএল ২০২৬-এর মহারণে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। ফাইনালে গুজরাত টাইটান্সকে তাদেরই ঘরের মাঠে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি জিতল বিরাট কোহলির দল। চাপের ম্যাচে ব্যাট হাতে নেতৃত্ব দিলেন কোহলি নিজেই। তাঁর অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংস বেঙ্গালুরুকে এনে দিল স্মরণীয় এক জয়।
অহমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ফাইনাল হলেও গ্যালারির আবহ দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি যেন বেঙ্গালুরুর ঘরের মাঠেই হচ্ছে। প্রায় এক লক্ষেরও বেশি দর্শকের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন আরসিবি সমর্থক। বিরাট কোহলির জনপ্রিয়তা এবং দলের সাম্প্রতিক সাফল্য স্টেডিয়ামকে লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল।
ফাইনালে টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক রজত পাটীদার। সেই সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই কাজে দেয়। গুজরাতের দুই প্রধান ভরসা শুভমন গিল ও সাই সুদর্শনকে দ্রুত ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বেঙ্গালুরুর বোলাররা।
জশ হেজলউড এবং ভুবনেশ্বর কুমার নতুন বলে শর্ট বলের কৌশল প্রয়োগ করেন। শুভমন মাত্র ১০ রান করে আউট হন, অন্যদিকে সাই সুদর্শনও ১২ রানের বেশি করতে পারেননি। গুজরাতের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় শুরুতেই।
শুরুতে ধাক্কা খাওয়ার পর গুজরাতের ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করেন জস বাটলার, নিশান্ত সিন্ধু এবং ওয়াশিংটন সুন্দর। কিন্তু কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। মাঝের ওভারগুলোতে রান তোলার গতি অনেকটাই কমে যায়।
এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল ১৫০ রানও হয়তো করতে পারবে না গুজরাত। তবে ওয়াশিংটন সুন্দর শেষ পর্যন্ত একাই লড়াই চালিয়ে যান। ৩৭ বলে অপরাজিত ৫০ রান করে দলকে ১৫৫ রানের সম্মানজনক সংগ্রহ এনে দেন।
বেঙ্গালুরুর হয়ে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন রাসিখ দার। তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন। এছাড়া হেজলউড ও ভুবনেশ্বর দুটি করে উইকেট শিকার করেন।
১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় বেঙ্গালুরুর দুই ওপেনার বিরাট কোহলি ও বেঙ্কটেশ আয়ারকে।
ম্যাচের প্রথম ওভারেই চোট পান বেঙ্কটেশ। হাঁটুতে বল লাগার পর কিছুটা অস্বস্তিতে থাকলেও তিনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান। মাত্র ১৬ বলে ৩২ রান করে দলের জন্য দারুণ ভিত গড়ে দেন।
অন্যদিকে কোহলি শুরুতে কিছুটা সময় নিলেও দ্রুত গিয়ার বদলে ফেলেন। কাগিসো রাবাডার এক ওভারে তিনটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন। মাত্র ৩.৩ ওভারে দু’জন মিলে ৫০ রানের জুটি গড়ে তোলেন।
গুজরাতের বোলাররা শুরু থেকেই উইকেট নেওয়ার তাড়নায় পরিকল্পনা হারিয়ে ফেলেন। নির্দিষ্ট লেংথে বল করতে ব্যর্থ হওয়ায় সুযোগ নেয় বেঙ্গালুরু।
দুটি উইকেট হারালেও পাওয়ার প্লে শেষে স্কোরবোর্ডে উঠে যায় ৭০ রান। এই দ্রুত রান তোলাই পরবর্তীতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
গুজরাতকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন রশিদ খান। এক ওভারে রজত পাটীদার ও ক্রুণাল পাণ্ড্যকে ফিরিয়ে দেন তিনি। কিছু সময়ের জন্য চাপে পড়ে যায় বেঙ্গালুরু।
তবে এক প্রান্তে অবিচল ছিলেন বিরাট কোহলি। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করে কেন তাঁকে ‘চেজ মাস্টার’ বলা হয়।
প্রতিটি বোলারের বিরুদ্ধে আলাদা পরিকল্পনা নিয়ে খেলেন তিনি। ঝুঁকি কমিয়ে প্রয়োজনীয় রান তোলার পথ বেছে নেন। ২৫ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন কোহলি।
পঞ্চম উইকেটে টিম ডেভিডের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন কোহলি। ডেভিড কয়েকটি বড় শট খেলে রান রেট নিয়ন্ত্রণে রাখেন। ২৪ রান করে আউট হলেও তিনি ম্যাচের গতি বেঙ্গালুরুর দিকে নিয়ে আসেন।
এরপর জিতেশ শর্মাকে সঙ্গে নিয়ে কোহলি জয়ের বাকি কাজ সম্পূর্ণ করেন।
ইনিংসের শেষ দিকে ৬৩ রানে একটি কঠিন সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শুভমন গিল ক্যাচ নেওয়ার দাবি করেন এবং আম্পায়ারও প্রথমে আউট দেন। তবে রিপ্লেতে দেখা যায় বল মাটি স্পর্শ করেছিল। ফলে জীবন পান কোহলি।
এই সুযোগ আর নষ্ট করেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রান করে দলকে জয় এনে দেন। একটি দুর্দান্ত ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করেন তিনি।
এই শিরোপা জয়ের মাধ্যমে বিরাট কোহলি আইপিএলের ইতিহাসে বিরল এক কৃতিত্ব অর্জন করলেন। টানা দুইবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি মহেন্দ্র সিংহ ধোনি এবং রোহিত শর্মার বিশেষ রেকর্ডের পাশে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন।
বহু বছর ধরে ট্রফির অপেক্ষায় থাকা বেঙ্গালুরু এখন আইপিএলের অন্যতম সফল দল। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিরাট কোহলি।
আইপিএল ২০২৬ ফাইনাল ছিল বিরাট কোহলির মঞ্চ। গুজরাত টাইটান্সের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর শান্ত, পরিণত এবং দায়িত্বশীল ব্যাটিং বেঙ্গালুরুকে এনে দিয়েছে আরেকটি শিরোপা। বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স, ওপেনারদের দ্রুত সূচনা এবং কোহলির ম্যাচজয়ী ইনিংস—সব মিলিয়ে চ্যাম্পিয়নের মতো খেলেই আবারও আইপিএলের সিংহাসনে বসেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।

