আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : প্রকৃতির ভাণ্ডারে এমন অনেক উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের জীবনযাপন সাধারণ গাছপালার চেয়ে একেবারেই আলাদা। কেউ পানির নিচে জন্মায়, কেউ মরুভূমির প্রচণ্ড গরমেও টিকে থাকে। তবে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে পাওয়া একটি রহস্যময় উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ, এই উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সূর্যের আলো প্রায় প্রয়োজনই হয় না।
অদ্ভুত দেখতে এই উদ্ভিদের নাম থিসমিয়া ডেমোনা (Thismia demona)। এর কালচে চেহারা এবং শুঁড়ের মতো গঠন দেখে অনেকেই একে ‘ডেভিল ফ্লাওয়ার’ বা ‘শয়তানের ফুল’ নামে ডাকছেন। মাটির ওপরে এর সামান্য অংশ দেখা গেলেও উদ্ভিদের বড় অংশই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে।
রহস্যময় কালো ফুলের অদ্ভুত চেহারা
প্রথম দেখায় থিসমিয়া ডেমোনাকে ফুল বলে চেনা বেশ কঠিন। এর গঠন প্রচলিত ফুলের মতো নয়। কালচে রঙের ছোট্ট ফুলটির চারপাশে রয়েছে অদ্ভুত আকৃতির অংশ, যা দেখতে অনেকটা শুঁড়ের মতো।
এই অস্বাভাবিক গঠনই উদ্ভিদটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। গভীর জঙ্গলের মাটির স্তর ভেদ করে যখন ফুলের অংশটি বাইরে আসে, তখন সেটিকে অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের সিনেমায় দেখা অচেনা কোনো প্রাণীর মতো মনে হতে পারে।
তবে এর ভয়ংকর চেহারার আড়ালে রয়েছে আরও আশ্চর্যজনক একটি জীবনপ্রণালি।
সূর্যের আলো ছাড়াই কীভাবে বেঁচে থাকে?
সাধারণ গাছপালা সূর্যের আলো ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে নিজেদের খাবার তৈরি করে। পাতার ক্লোরোফিল সূর্যের আলো শোষণ করে এবং সেই শক্তি ব্যবহার করে উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে। কিন্তু থিসমিয়া ডেমোনার ক্ষেত্রে সেই পরিচিত নিয়ম কাজ করে না।
এই উদ্ভিদের শরীরে ক্লোরোফিল নেই। ফলে অন্য সবুজ উদ্ভিদের মতো সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাবার তৈরির ক্ষমতাও এর নেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো, সূর্যের আলো ছাড়াই এমন একটি উদ্ভিদ বছরের পর বছর টিকে থাকে কীভাবে?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মাটির নিচে।
ছত্রাকের ওপর নির্ভর করে এই অদ্ভুত উদ্ভিদ
থিসমিয়া ডেমোনা মাটির নিচে থাকা বিশেষ ধরনের ছত্রাকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। সেই সম্পর্কের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে উদ্ভিদটি।
সহজভাবে বললে, সাধারণ গাছ যেমন সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে নিজের খাবার তৈরি করে, থিসমিয়া ডেমোনা তেমন করে না। বরং মাটির নিচের ছত্রাকের সঙ্গে তৈরি হওয়া বিশেষ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে পুষ্টি পায়।
উদ্ভিদটির এই জীবনযাপন বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখিয়ে দেয়, উদ্ভিদের জগতে বেঁচে থাকার কৌশল কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
মাটির নিচেই কাটে জীবনের বড় সময়
থিসমিয়া ডেমোনার আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অধিকাংশ অংশ মাটির নিচে থাকে। বাইরে থেকে সাধারণত শুধু ফুলের অংশটি দেখা যায়। ফলে বছরের বেশিরভাগ সময় এই উদ্ভিদ মানুষের চোখের আড়ালেই থাকতে পারে।
এই কারণেই এমন উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। ঘন জঙ্গল, মাটির নিচের পরিবেশ এবং অত্যন্ত ছোট আকৃতি—সব মিলিয়ে এর অস্তিত্ব শনাক্ত করা গবেষকদের জন্যও সহজ নয়।
বর্ষা বা উপযুক্ত পরিবেশে যখন ফুলের অংশ মাটির ওপরে আসে, তখনই গবেষকেরা এর উপস্থিতি শনাক্ত করার সুযোগ পান।
থিসমিয়া ডেমোনা কেন এত বিরল?
গবেষকদের কাছে এই উদ্ভিদ শুধু অদ্ভুত চেহারার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর বিরলতাও বড় বিষয়। প্রকৃতিতে থিসমিয়া গণের উদ্ভিদ এমনিতেই খুব কম দেখা যায়। নতুন প্রজাতি হিসেবে থিসমিয়া ডেমোনার সন্ধান সেই বিরল উদ্ভিদজগত সম্পর্কে আরও গবেষণার দরজা খুলে দিয়েছে।
এ ধরনের উদ্ভিদের অস্তিত্ব একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশেষ করে মাটির নিচে থাকা ছত্রাকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু গাছ কেটে জঙ্গল ধ্বংস করাই নয়, মাটির পরিবেশের পরিবর্তনও এই ধরনের উদ্ভিদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে মিলেছে সন্ধান
থিসমিয়া ডেমোনার সন্ধান মিলেছে থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের গভীর জঙ্গলে। এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন বনাঞ্চলের মাটির নিচে এমন অনেক অজানা জীব ও উদ্ভিদ এখনও থাকতে পারে, যেগুলোর সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা খুবই সীমিত।
ডেভিল ফ্লাওয়ারের আবিষ্কার তাই শুধু একটি নতুন উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর পরিচিত বনাঞ্চলেও প্রকৃতির বহু রহস্য এখনও মানুষের অজানা।
বিরল উদ্ভিদ সংরক্ষণ কেন জরুরি?
থিসমিয়া ডেমোনার মতো বিরল উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এদের জীবনযাপন নির্দিষ্ট পরিবেশ ও নির্দিষ্ট জীবের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। সেই পরিবেশে সামান্য পরিবর্তন হলেও পুরো জীবনচক্র ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষ করে বন উজাড়, মাটির গুণমানের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে এই ধরনের উদ্ভিদ ভবিষ্যতে আরও বিপদের মুখে পড়তে পারে।
একটি বিরল উদ্ভিদ হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রজাতিই হারায় না। এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে অসংখ্য অণুজীব, ছত্রাক ও পরিবেশগত সম্পর্ক। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এমন অদ্ভুত ও বিরল উদ্ভিদকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতির এখনও কত রহস্য অজানা!
থিসমিয়া ডেমোনা আমাদের পরিচিত উদ্ভিদজগতের ধারণাকেই যেন একটু বদলে দেয়। সূর্যের আলো নেই, ক্লোরোফিল নেই, পাতাও প্রায় নেই—তবু মাটির নিচে ছত্রাকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে টিকে আছে একটি ফুলগাছ।
দেখতে অদ্ভুত হলেও এই ‘কালো ডেভিল ফ্লাওয়ার’ আসলে প্রকৃতির অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার একটি উদাহরণ। পৃথিবীর জঙ্গলে এখনও এমন কত উদ্ভিদ, ছত্রাক কিংবা ক্ষুদ্র জীব লুকিয়ে আছে, যাদের মানুষ চেনে না—তার হিসাব নেই।
থিসমিয়া ডেমোনার মতো আবিষ্কার তাই শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্যও একটি বার্তা বহন করে। পৃথিবীকে আমরা যতটা চিনি বলে মনে করি, প্রকৃতি তার চেয়েও অনেক বেশি রহস্যময়। আর সেই রহস্য ধরে রাখতে বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করাই সবচেয়ে জরুরি।





