spot_imgspot_img

সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশকমছে সমুদ্রে যাওয়ার দিন, মিলছে না পরিচিত মাছ, জলবায়ু পরিবর্তনে বিপদে ভারতের...

কমছে সমুদ্রে যাওয়ার দিন, মিলছে না পরিচিত মাছ, জলবায়ু পরিবর্তনে বিপদে ভারতের মৎস্যজীবীরা

বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলের ছোট মৎস্যজীবীদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত একটি নতুন মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বে অফ বেঙ্গল প্রোগ্রাম ইন্টার-গভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশন বা বিওবিপি-আইজিওর এই মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তায়।

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : সমুদ্রের সঙ্গে তাঁদের জীবন ও জীবিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া, মাছ ধরে ফিরে এসে সেই মাছ বিক্রি করেই সংসার চালানো—এটাই ভারতের বহু ছোট মৎস্যজীবী পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা। কিন্তু সেই সমুদ্রই এখন তাঁদের কাছে ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘন ঘন দুর্যোগ, বদলে যাওয়া বর্ষার ধরন এবং সমুদ্রে মাছের জোগান কমে যাওয়ায় ছোট মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কখনও উত্তাল সমুদ্রের কারণে নৌকা নিয়ে বের হওয়া যাচ্ছে না, আবার কখনও ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতায় দিনের পর দিন তীরে বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন মাছ ধরার সুযোগ কমছে, অন্যদিকে তেমনই কমছে আয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে মৎস্যজীবীদের জীবন

বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলের ছোট মৎস্যজীবীদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত একটি নতুন মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বে অফ বেঙ্গল প্রোগ্রাম ইন্টার-গভর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশন বা বিওবিপি-আইজিওর এই মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তায়।

প্রতিবেদনে ছোট মৎস্যজীবীদের জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সমুদ্রের পরিবেশ বদলে যাওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার আচরণেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাছ ধরা এবং মৎস্যজীবীদের আয়ের ওপর।

কমছে সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ

ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। যেদিন সমুদ্রে যেতে পারেন, সেদিনই মাছ ধরার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে সেই সুযোগ আর থাকে না।

সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠলে ছোট নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন নৌকাগুলোকে নিরাপদে তীরে ফিরিয়ে আনতে হয় এবং অনেক সময় কয়েক দিন পর্যন্ত সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ থাকে।

বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পভিত্তিক মৎস্য সংস্থার তুলনায় ছোট মৎস্যজীবীদের আর্থিক সুরক্ষা কম। তাই কয়েক দিন মাছ ধরতে না পারার অর্থ তাঁদের পরিবারের আয় প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

বদলে যাচ্ছে মাছের জোগানও

শুধু সমুদ্রে যাওয়ার দিন কমে যাওয়া নয়, মাছের প্রাপ্যতাতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন মৎস্যজীবীরা। তাঁদের অভিজ্ঞতায় সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, ঋতুচক্র আগের মতো নির্ভরযোগ্য থাকছে না এবং ঝড়ের আচরণও বদলাচ্ছে।

কিছু পরিচিত মাছের জোগান কমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন মৎস্যজীবীরা। বিশেষ করে সার্ডিনের মতো মাছের পরিমাণ নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মাছের অবস্থান ও প্রাপ্যতা বদলে গেলে ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য সমস্যা আরও বাড়ে। কারণ তাঁরা সাধারণত সীমিত ক্ষমতার নৌকা ও সরঞ্জাম ব্যবহার করেন। মাছের সন্ধানে অনেক দূরে যাওয়ার মতো সুযোগ বা প্রযুক্তি তাঁদের হাতে থাকে না।

উত্তাল সমুদ্র মানেই পরিবারের আয় বন্ধ

একজন ছোট মৎস্যজীবীর জীবনে সমুদ্রের প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে। একটি নৌকা সমুদ্রে না গেলে শুধু একজনের আয় বন্ধ হয় না, তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।

ধরা যাক, খারাপ আবহাওয়ার কারণে টানা চার-পাঁচ দিন সমুদ্রে যাওয়া গেল না। এই কয়েক দিনের মধ্যে খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা দৈনন্দিন খরচ চালানোই পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এর সঙ্গে যদি নৌকা বা মাছ ধরার সরঞ্জাম ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। নতুন সরঞ্জাম কেনার মতো অর্থ অনেক পরিবারের কাছেই থাকে না।

জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যুক্ত আরও কিছু সমস্যা

ছোট মৎস্যজীবীদের সংকট শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও বেশ কিছু দীর্ঘদিনের সমস্যা।

মাছ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে দ্রুত মাছ বাজারজাত করতে হয়। এতে অনেক সময় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। আবার নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে বহু ক্ষেত্রে।

এর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া তথ্যের অভাব মৎস্যজীবীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। সমুদ্রে যাওয়ার আগে কখন আবহাওয়া খারাপ হতে পারে, কোথায় ঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে বা সমুদ্র কতটা উত্তাল হতে পারে—এসব তথ্য সময়মতো পাওয়া গেলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে?

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও ছোট মৎস্যজীবীদের ঝুঁকি কমানোর জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ নৌকা সরবরাহ, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নৌকা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও জরুরি।

মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বছরের সব সময় সমুদ্রে মাছ ধরার সুযোগ না থাকলে পরিবারের আয়ের অন্য পথ থাকা প্রয়োজন। উপকূলীয় অঞ্চলে কোন এলাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার নির্দিষ্ট মূল্যায়ন করাও প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

সামনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা

ভারতের ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কারণ সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ শুধু মাছের জোগানের ওপর নির্ভর করছে না। নিরাপদে সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ, দুর্যোগের সময় সুরক্ষা, ন্যায্য বাজারদর এবং বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও তাঁদের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পরিবেশ যত বদলাবে, ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য অনিশ্চয়তাও তত বাড়তে পারে। তাই তাঁদের সমস্যাকে শুধু মৎস্য খাতের সংকট হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন।

সমুদ্র আজও তাঁদের জীবনের প্রধান ভরসা। কিন্তু সেই সমুদ্রকে নিরাপদ ও টেকসইভাবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার পরিবারের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

সূত্র: সংবাদ সংস্থার সহায়তায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ