বিনোদন ডেস্ক : বলিউডে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেগুলি মুক্তির বহু বছর পরেও দর্শকের মনে থেকে যায়। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জিস্ম’ তেমনই একটি ছবি। সাহসী বিষয়বস্তু, সম্পর্কের জটিলতা এবং বিপাশা বসুর ব্যতিক্রমী উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ছবিটি সেই সময় যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছিল। এই ছবিতে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যে সহজ ছিল না, তা এবার নিজেই জানালেন অভিনেত্রী।
দীর্ঘ বিরতির পর ফের অভিনয়ের জগতে ফিরছেন বিপাশা বসু। প্রত্যাবর্তনের আগে এক সাক্ষাৎকারে নিজের কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘জিস্ম’-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ছবিটিতে অভিনয় করার আগে ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষ তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। এমনকি বলা হয়েছিল, এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলে তাঁর কেরিয়ারও শেষ হয়ে যেতে পারে।
২০০১ সালে ‘অজনবী’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন বিপাশা বসু। এরপর ‘রাজ়’-এর মতো সফল ছবিতে অভিনয় করে দ্রুত নিজের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি। তবে ২০০৩ সালের ‘জিস্ম’ তাঁর কেরিয়ারে একেবারে অন্য মাত্রা যোগ করে।
ছবিতে সোনিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিপাশা। চরিত্রটির মধ্যে ছিল প্রেম, আবেগ, আকর্ষণ এবং সম্পর্কের নানা জটিলতা। সেই সময় এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীর জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবেই দেখেছিলেন অনেকে।
বিপাশা জানিয়েছেন, ছবিটি করার আগে ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তাঁকে কাজটি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ‘জিস্ম’-এর মতো সাহসী ছবিতে অভিনয় করলে দর্শকের একটি বড় অংশ তাঁকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করবে। এমনকি ভবিষ্যতে মূলধারার ছবিতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে।
কিন্তু বিপাশা সেই পরামর্শে পিছিয়ে যাননি। তাঁর কাছে চরিত্রটি যথেষ্ট আকর্ষণীয় ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, একজন অভিনেত্রী হিসেবে এমন একটি চরিত্র তাঁকে নিজের অভিনয়ের অন্য দিক তুলে ধরার সুযোগ দেবে।
‘জিস্ম’-এ সাহসী দৃশ্য থাকার কারণেই ছবিটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল। সেই সময় এমন দৃশ্যে অভিনয় করা নিয়ে বলিউডে এখনও যথেষ্ট দ্বিধা ছিল। ফলে বিপাশার সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে অভিনেত্রীর বক্তব্য ছিল, ছবিটির গল্প মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি। তাই চরিত্রটির প্রয়োজন অনুযায়ী অভিনয় করতেই তিনি রাজি হয়েছিলেন।
বিপাশার কাছে বিষয়টি শুধুমাত্র সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করার ছিল না। তিনি দেখেছিলেন সোনিয়া চরিত্রের বিভিন্ন স্তর। চরিত্রটির মানসিকতা, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং গল্পে তার ভূমিকা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
এই কারণেই সম্ভাব্য সমালোচনা বা কেরিয়ার নিয়ে ভয়কে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি ছবিটিতে অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সময়ের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তই তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
শুধু অভিনয় নয়, ‘জিস্ম’-এ বিপাশার লুকও দর্শকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। গাঢ় কাজল, ঢেউ খেলানো চুল, সাদা পোশাক এবং সমুদ্রসৈকতের আবহ—সব মিলিয়ে তাঁর পর্দার উপস্থিতি সে সময় আলাদা করে নজর কেড়েছিল।
বিপাশার মতে, ছবিটির পর তাঁর লুক অনেকের কাছে নতুন ধরনের ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ঢেউ খেলানো চুল এবং গাঢ় চোখের মেকআপ তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
অভিনেত্রীর কথায়, সেই সময় হঠাৎ করেই এমন সাজপোশাক জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তাঁর মনে হয়েছিল, ছবিটির মাধ্যমে তিনি শুধু একটি চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং পর্দায় নারীদের উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছিলেন।
বলিউডে একজন অভিনেত্রীর জন্য নিজের পছন্দ অনুযায়ী চরিত্র বেছে নেওয়া সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন অভিনেত্রীদের নিয়ে সমাজের প্রত্যাশা অনেক বেশি নির্দিষ্ট ছিল।
বিপাশার ক্ষেত্রে ‘জিস্ম’ সেই প্রচলিত ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করেছিল। তিনি এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যেখানে নারী চরিত্রকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখা হয়নি। তাঁর চরিত্রের নিজস্ব ইচ্ছা, আবেগ এবং সিদ্ধান্ত ছিল।
এ কারণেই ছবিটিকে নিজের কেরিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করেন বিপাশা। তাঁর মতে, কোনও চরিত্র নিয়ে সমাজ কী ভাববে, সেই ভয়কে সবসময় সামনে রাখলে একজন শিল্পীর পক্ষে নতুন কিছু করা সম্ভব নয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি বিপাশা বসু দীর্ঘদিন ধরে নিজের ফিটনেসের জন্য পরিচিত। তাঁর ছিপছিপে অথচ পেশিবহুল শরীর এক সময় বলিউডে অভিনেত্রীদের প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণাকেও বদলে দিয়েছিল।
সেই সময় অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পেশিবহুল শরীরকে খুব একটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হত না। কিন্তু বিপাশা নিজের শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন অভিনেত্রীর সৌন্দর্য শুধু রোগা বা নির্দিষ্ট শারীরিক গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁর মতে, নিজেকে ভালোবাসা এবং সুস্থ থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দেখতে সুন্দর লাগলেই সবকিছু পূর্ণ হয় না। শরীর ও মন—দুই দিক থেকেই সুস্থ থাকা দরকার।
এই ভাবনাই বিপাশার ফিটনেস দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে বহু তরুণ-তরুণী তাঁর ফিটনেস রুটিন এবং জীবনযাপন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ততার কারণে বেশ কিছুটা সময় অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন বিপাশা বসু। এবার ফের ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চলেছেন তিনি।
হংসল মেহতার পরিচালনায় একটি সিরিজ়ের মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাবর্তন হতে চলেছে। এই সিরিজ়ে বিপাশার সঙ্গে দেখা যাবে সনী কৌশল এবং বিশাল জেঠওয়াকে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একাধিক ধরনের চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এবার নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের সঙ্গে পর্দায় তাঁর রসায়ন কেমন হয়, সেটিও দেখার বিষয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘জিস্ম’-এর সময়কার সেই সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে তাকালে বিপাশার মনে কোনও আফসোস নেই। বরং তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, নিজের পছন্দের চরিত্রে বিশ্বাস রেখেই তিনি সেই সময় ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
যে ছবির জন্য একসময় তাঁকে কেরিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কবার্তা শুনতে হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিচিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ছবিটির লুক এবং তাঁর ফিটনেস ভাবনাও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছিল।
বিপাশার গল্প তাই শুধু একটি সাহসী ছবিতে অভিনয়ের গল্প নয়। এটি নিজের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখার গল্পও। আর দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর প্রত্যাবর্তন সেই পুরনো আত্মবিশ্বাসের নতুন অধ্যায় খুলতে চলেছে।



