Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_img
Homeবাংলা নিউজবাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঘরোয়া শরবত: গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা প্রাচীন শীতল পানীয়ের...

বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঘরোয়া শরবত: গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা প্রাচীন শীতল পানীয়ের সহজ রেসিপি

প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করা দুপুর, ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফেরা আর তারপর এক গ্লাস ঠান্ডা ঘরোয়া শরবত— এই অনুভূতির সঙ্গে বাঙালির শৈশব জড়িয়ে আছে গভীর ভাবে। আজকের দিনে বাজার ভর্তি ঠান্ডা পানীয়, কোল্ড ড্রিংক কিংবা প্যাকেটজাত জুসের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই সব পুরনো ঘরোয়া শরবত। অথচ একসময় দিদিমা-ঠাকুমাদের হাতের তৈরি এই পানীয়ই ছিল গরমে প্রাণ জুড়িয়ে দেওয়ার একমাত্র ভরসা।

তখন বাড়িতে ফ্রিজ থাকত না সবার। মাটির জালা বা কুঁজোর ঠান্ডা জলেই মিটত তৃষ্ণা। আর সামান্য কিছু উপকরণ দিয়ে তৈরি হত এমন সব শরবত, যার স্বাদ আজও মনে পড়লে নস্টালজিয়া ভর করে। এই গরমে ফিরে দেখা যাক বাঙালির সেই হারিয়ে যাওয়া শীতল পানীয়গুলিকে, যেগুলি শুধু সুস্বাদুই নয়, শরীরের পক্ষেও অত্যন্ত উপকারী।

বাতাসা-কর্পূরের শরবত: এক চুমুকে পুরনো দিনের স্বাদ

একসময় প্রায় সব বাঙালি বাড়িতেই গুড়ের বাতাসা মজুত থাকত। অতিথি এলে ঠান্ডা জলের সঙ্গে বাতাসা পরিবেশন ছিল সাধারণ রীতি। সেই বাতাসা দিয়েই তৈরি হত দারুণ স্বাদের শরবত।

ঠান্ডা জলে কয়েকটি বাতাসা ভিজিয়ে রাখতে হবে। বাতাসা পুরো গলে গেলে তাতে সামান্য পাতিলেবুর রস বা গোলাপজল মেশান। শেষে এক চিমটে খাওয়ার কর্পূর দিলেই তৈরি হয়ে যাবে সুগন্ধি ও শীতল পানীয়।

এই শরবত শুধু শরীর ঠান্ডাই রাখে না, ক্লান্তিও দূর করে মুহূর্তে।

মঠের শরবত: রঙিন স্মৃতির শীতল পানীয়

দোল বা রথের মেলায় কেনা রঙিন মঠ ছিল ছোটদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। গোলাপি, হলুদ বা সাদা মঠ জলে গুলে তৈরি হত সুন্দর রঙের শরবত।

মঠ আধ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। পুরো গলে গেলে তাতে বিটনুন ও গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। চাইলে গোলাপজলও ব্যবহার করতে পারেন।

এই শরবতের বিশেষত্ব তার রং এবং হালকা মিষ্টি স্বাদ। গরম দুপুরে এটি ছিল এক অন্যরকম প্রশান্তি।

তেঁতুল-গুড়ের শরবত: স্বাদ ও স্বাস্থ্যের দুর্দান্ত মেলবন্ধন

তেঁতুলের টক আর গুড়ের মিষ্টি— এই দুইয়ের মিশেলে তৈরি শরবত গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অসাধারণ কার্যকর।

পাকা তেঁতুল জলে ভিজিয়ে তার ক্বাথ বের করে নিন। এবার তাতে আখের গুড়, বিটনুন এবং সামান্য ভাজা জিরেগুঁড়ো মিশিয়ে ঠান্ডা জলে গুলে ছেঁকে নিলেই তৈরি শরবত।

এই পানীয়ে রয়েছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গরমে শরীরের জলের ঘাটতি পূরণেও এটি সাহায্য করে।

মৌরি-মিছরির জল: পেট ঠান্ডা রাখার প্রাচীন উপায়

গরমে পেট গরম বা অ্যাসিডিটির সমস্যা হলে বাড়ির বড়রা ভরসা রাখতেন মৌরি-মিছরির জলের উপর।

রাতে এক গ্লাস জলে মৌরি ও তালমিছরি ভিজিয়ে রাখুন। সকালে সেই জল ছেঁকে পান করুন। এর হালকা মিষ্টি স্বাদ ও সুন্দর গন্ধ ছোটদেরও খুব পছন্দ ছিল।

মৌরি হজমশক্তি বাড়ায় এবং তালমিছরি শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তাই এই শরবত আজও সমান কার্যকর।

বেলের পানা: গরমে হিটস্ট্রোক রুখতে অব্যর্থ

বাঙালির গ্রীষ্ম মানেই বেলের পানা। পাকা বেলের শাঁস, গুড় আর ঠান্ডা জল দিয়েই তৈরি হয় এই ঐতিহ্যবাহী পানীয়।

প্রথমে বেলের শাঁস জল দিয়ে ভালো করে চটকে নিতে হবে। তারপর ছাঁকনিতে ছেঁকে বীজ ও আঁশ আলাদা করে নিন। এবার তাতে গুড় ও ঠান্ডা জল মিশিয়ে তৈরি করুন বেলের পানা। স্বাদ বাড়াতে সামান্য বিটনুনও দেওয়া যায়।

বেলে থাকা ফাইবার হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। পাশাপাশি গরমে ‘লু’ বা হিটস্ট্রোক থেকেও শরীরকে রক্ষা করে।

গন্ধরাজ ঘোল: বাঙালির প্রিয় গরমের পানীয়

এখনও জনপ্রিয় এই ঘরোয়া পানীয় খুব সহজেই বাড়িতে তৈরি করা যায়। দরকার শুধু টক দই, বিটনুন, চিনি এবং গন্ধরাজ লেবু।

প্রথমে দই ভালো করে ফেটিয়ে নিন। তারপর তাতে নুন, চিনি ও ঠান্ডা জল মিশিয়ে গন্ধরাজ লেবুর রস দিন। উপরে লেবুর পাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করলে সুগন্ধ আরও বেড়ে যায়।

গন্ধরাজ ঘোল শরীর ঠান্ডা রাখে এবং হজমেও সাহায্য করে। গরম দুপুরে এটি একেবারে আদর্শ পানীয়।

তোকমার শরবত: আজকের ‘বেসিল সিডস’-এর পুরনো বাংলা রূপ

আজ যাকে বেসিল সিডস বলা হয়, বাংলায় বহুদিন ধরেই তা পরিচিত ‘তোকমা দানা’ নামে।

মিছরির জলে তোকমা দানা আধ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। ফুলে উঠলে তাতে লেবুর রস ও পরিমাণমতো ঠান্ডা জল মিশিয়ে পরিবেশন করুন।

এই শরবত শরীর ঠান্ডা রাখে, ডিটক্স করতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও কমায়।

সাবুদানার ঘোল: সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর শরবত

আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা সাবুদানার সঙ্গে টক দই, বিটনুন, গোলমরিচ ও তালমিছরি মিশিয়ে তৈরি হয় এই বিশেষ পানীয়।

গরমকালে ক্লান্তি দূর করতে এবং পেট ভালো রাখতে সাবুদানার ঘোল খুব উপকারী। সাবুদানা সহজে হজম হয় এবং পাকস্থলীর প্রদাহ কমাতেও সাহায্য করে।

শিবরাত্রির ব্রতের সময় এই পানীয় খাওয়ার চল থাকলেও এখন গরমের দিনের স্বাস্থ্যকর ড্রিংক হিসেবেও এটি জনপ্রিয় হতে পারে।

ডাবের শরবত: প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটে ভরপুর শীতল পানীয়

ডাবের জল এমনিতেই গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অত্যন্ত কার্যকর। তার সঙ্গে যদি ডাবের শাঁস, পুদিনা ও গন্ধরাজ লেবুর মিশেল হয়, তবে স্বাদ আরও বেড়ে যায়।

ডাবের নরম শাঁস বেটে নিয়ে তাতে ডাবের জল, পুদিনা পাতার রস ও গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে দিন। শেষে বরফকুচি দিলেই তৈরি অসাধারণ স্বাদের ডাবের শরবত।

এই পানীয় শরীরে প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটের জোগান দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।

হারিয়ে যাওয়া বাঙালি শরবতের ফিরে আসার সময় কি এবার?

আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই স্বাস্থ্যকর ঘরোয়া পানীয়ের বদলে ভরসা রাখছেন কৃত্রিম ঠান্ডা পানীয়ের উপর। কিন্তু বাঙালির এই পুরনো শরবতগুলি শুধু স্বাদের দিক থেকে নয়, স্বাস্থ্যগুণের দিক থেকেও অনেক এগিয়ে।

অল্প উপকরণ, সহজ রেসিপি এবং অসাধারণ উপকারিতা— সব মিলিয়ে এই ঘরোয়া কুলারগুলি আবারও জায়গা করে নিতে পারে আমাদের রান্নাঘরে। এই গরমে তাই একদিন সময় করে বানিয়ে ফেলতেই পারেন দিদিমার হাতের সেই পুরনো শরবত। হয়তো এক চুমুকেই ফিরে পাবেন হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্বাদ।