সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeসর্বশেষ সংবাদডেঙ্গু সংক্রমণ অক্টোবর-নভেম্বরে আরও বাড়ার আশঙ্কা

ডেঙ্গু সংক্রমণ অক্টোবর-নভেম্বরে আরও বাড়ার আশঙ্কা

সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনের চিত্র আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই সাত দিনে ৮ হাজার ৫৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর : বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পবিবেশ ,আবহাওয়ার পরিবর্তন, এডিস মশার বিস্তার, অপর্যাপ্ত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং মানুষের অসচেতনতার জন্যই ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্ট থেকে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সংক্রমন আরও তীব্র হ্রয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ অবস্থায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে চলতি বছরের শেষ দিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভবনা রযেছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের আগস্ট মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬ জন। ওই মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৪৩ জনের।

এর আগে জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুলাই মাসে মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনের চিত্র আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই সাত দিনে ৮ হাজার ৫৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ অথবা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ সময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর বড় ধাক্কার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, কর্মস্থল এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানোর কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উড়ন্ত বা প্রাপ্তবয়স্ক মশা দমনের পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করাই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেনসহ যেসব স্থানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে অভিযান চালালে হবে না; স্থানীয় পর্যায়েও ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শক্তিশালী করতে হবে।

একসময় ডেঙ্গুকে মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের চলাচল এবং আন্তঃজেলা যোগাযোগের কারণে ভাইরাসটি দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শুধু বড় শহরগুলোতে অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অনেক মানুষ দেরিতে হাসপাতালে যান। ফলে রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে।

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে ভাইরাসের সেরোটাইপের পরিবর্তনও বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেশে ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় ডেন-২ শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক সেরোটাইপ রয়েছে। একজন ব্যক্তি আগে একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই রোগ গুরুতর হবে এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, পূর্বের সংক্রমণসহ বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হতে হবে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা। এ জন্য কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।

তার মতে, শুধু লোক দেখানোভাবে কীটনাশক ছিটালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কোথায় মশা জন্ম নিচ্ছে, কোথায় লার্ভার ঘনত্ব বেশি এবং কোন এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। তাদের মধ্যে ৮৫১ জন পুরুষ এবং ৪৬৩ জন নারী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই হিসাব পাওয়া গেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৬৮ জন নারী এবং ৫৩ জন পুরুষ।

গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজন নারী এবং একজন পুরুষ। একই সময়ে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে।

তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ