বিনোদন ডেস্ক : মোগল ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে এবার সেই বিতর্কে জায়গা করে নিয়েছে খাবার। কোফতা, কোর্মা, কাবাবের মতো জনপ্রিয় ভারতীয় খাবারের সঙ্গে মোগল ইতিহাসের যোগসূত্র টেনে মন্তব্য করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন প্রাক্তন অভিনেত্রী ও লেখিকা টুইঙ্কল খন্না। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র মতবিরোধ।
টুইঙ্কলের মন্তব্যকে ব্যঙ্গাত্মক বলেই মনে করছেন তাঁর অনুরাগীদের একাংশ। অন্যদিকে, নেটপ্রভাবী সীমা খের মনে করেন, ভারতের ইতিহাসের একটি হিংসাত্মক অধ্যায়কে খাবারের সঙ্গে তুলনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। এই দুই বিপরীত মত থেকেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
খাবার এবং তার উপকরণ নিয়ে চলা একটি বিতর্কের প্রসঙ্গেই নিজের মত প্রকাশ করেন টুইঙ্কল। মোগলদের ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি এবং ভারতীয় খাবারের জনপ্রিয়তার মধ্যে একটি ব্যঙ্গাত্মক তুলনা টানেন তিনি।
টুইঙ্কলের বক্তব্যের মূল কথা ছিল, যারা ইতিহাসের বই থেকে মোগলদের মুছে দিতে চান, তাদের আগে নিজেদের খাবারের তালিকাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ কোফতা, কোর্মা, কাবাব কিংবা মোগলাই ধরনের একাধিক খাবারের সঙ্গে মোগল আমলের খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইতিহাসের একটি অংশকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলার পাশাপাশি সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত খাবারকে আগের মতো উপভোগ করা কিছুটা স্ববিরোধী। তাঁর মন্তব্যের মধ্যে ছিল স্পষ্ট ব্যঙ্গ।
তবে সেই ব্যঙ্গ সবাই একইভাবে গ্রহণ করেননি।
টুইঙ্কল খন্নার বক্তব্যের বিরোধিতা করে সমাজমাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করেন সীমা খের। তাঁর মতে, মোগল আমলের হিংসা বা ভারতের ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়কে জনপ্রিয় খাবারের সঙ্গে তুলনা করে বিষয়টিকে হালকা করে দেখানো ঠিক নয়।
সীমা যুক্তি দেন, ইতিহাসে সংঘটিত নৃশংস ঘটনা এবং মানুষের খাবারের অভ্যাস—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা সমস্যাজনক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খাবার কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার নৈতিক মূল্যায়নের মাপকাঠি হতে পারে না।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ইতিহাসের কোনও সময়কে সমালোচনা করতে গেলে সেই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি সাংস্কৃতিক বিষয় কি মানুষকে বর্জন করতে হবে? নাকি ইতিহাসকে তার ভালো-মন্দ দুই দিক নিয়েই বোঝার চেষ্টা করা উচিত?
টুইঙ্কলকে জবাব দিতে গিয়ে তাঁর স্বামী অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘কেশরী’ ছবির প্রসঙ্গ সামনে আনেন সীমা খের। সারাগঢ়ীর যুদ্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল ছবিটি।
সীমার বক্তব্য, ঐতিহাসিক নানা ঘটনা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে যথেষ্ট পরিচিত থাকে না। সেই কারণেই ইতিহাসভিত্তিক সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘কেশরী’র মতো ছবি অতীতের যুদ্ধ, সাহস এবং সংঘর্ষের ঘটনাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারে।
এই প্রসঙ্গেই তিনি টুইঙ্কলকে একটি প্রশ্ন করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, টুইঙ্কল যদি ‘কেশরী’র মতো হিংসাত্মক ঐতিহাসিক ঘটনার উপর তৈরি ছবি দেখতে পারেন এবং সেই গল্পের আবেগে প্রভাবিত হতে পারেন, তাহলে পরে সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত খাবার উপভোগ করাকে কেন প্রশ্নের মুখে আনা হচ্ছে?
অর্থাৎ সীমা খেরের যুক্তি, ইতিহাসের কোনও ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা আর সেই সময়ের সাংস্কৃতিক প্রভাবকে গ্রহণ করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে রয়েছে ইতিহাসকে কীভাবে দেখা উচিত, সেই প্রশ্ন। একটি পক্ষ মনে করছে, ইতিহাসের কোনও বিশেষ সময়কে মুছে দেওয়ার কথা বলা হলে সেই সময়ের সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অন্য পক্ষের যুক্তি, ইতিহাসকে বিচার করতে গেলে সংস্কৃতি, খাবার কিংবা ভাষার মতো বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আদানপ্রদান হয়েছে। ফলে কোনও খাবারের উৎস একটি নির্দিষ্ট সময় বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি বৃহত্তর সমাজের অংশ হয়ে যেতে পারে।
ভারতীয় খাবারের ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ প্রচুর। বিভিন্ন রাজ্য, শাসক, বণিক এবং সংস্কৃতির প্রভাবে খাবারের ধরন বদলেছে। অনেক পদ সময়ের সঙ্গে স্থানীয় স্বাদ ও উপকরণের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ পেয়েছে।
তাই আজকের দিনে কোনও জনপ্রিয় খাবারকে শুধু তার ঐতিহাসিক উৎস দিয়ে বিচার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
টুইঙ্কল খন্নার মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সমাজমাধ্যমে দ্রুত আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই সীমা খেরের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, ইতিহাসের হিংসাত্মক ঘটনাকে খাবারের সঙ্গে তুলনা না করাই ভালো।
আবার টুইঙ্কলের অনুরাগীদের একাংশ তাঁর মন্তব্যকে নিছক ব্যঙ্গ হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, টুইঙ্কল কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা অস্বীকার করেননি। বরং ইতিহাস থেকে মোগলদের সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে মোগলাই খাবারের জনপ্রিয়তার বৈপরীত্য তুলে ধরতেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।
অর্থাৎ বিতর্কের একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে বক্তব্যের উদ্দেশ্য এবং তার ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে।
ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে কোর্মা, কোফতা, কাবাবের মতো পদ বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। বিভিন্ন অঞ্চলে এসব খাবার স্থানীয় উপকরণ ও স্বাদের সঙ্গে মিশে আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে।
ফলে কোনও খাবারের সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও বর্তমান সময়ে তার পরিচয় অনেক বেশি বিস্তৃত। রেস্তরাঁ থেকে শুরু করে বাড়ির রান্না—বিভিন্ন জায়গাতেই এই ধরনের পদ দেখা যায়।
এই কারণেই টুইঙ্কলের মন্তব্যকে কেউ কেউ ইতিহাস ও খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। আবার সমালোচকদের মতে, এমন তুলনা ইতিহাসের গুরুতর বিষয়কে অতি সরল করে দিতে পারে।
টুইঙ্কল খন্নার মন্তব্য এবং সীমা খেরের পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু দুই ব্যক্তির মতবিরোধে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ভারতের ইতিহাস, খাদ্যসংস্কৃতি এবং অতীতকে বর্তমান সময়ে কীভাবে দেখা উচিত—সেই বৃহত্তর প্রশ্ন।
একদিকে রয়েছে ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার প্রয়োজন। অন্যদিকে রয়েছে সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা দিয়ে বোঝার বিষয়।
সব মিলিয়ে, কোফতা, কোর্মা ও কাবাবকে ঘিরে শুরু হওয়া এই বিতর্ক আবারও দেখিয়ে দিল, ভারতে খাবার শুধু খাবার নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয় এবং মানুষের আবেগও। টুইঙ্কল খন্নার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য তাই সহজেই পৌঁছে গেছে সমাজমাধ্যমের বিতর্কের কেন্দ্রে। আর সীমা খেরের পাল্টা প্রশ্ন সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।


