সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশ্ব সংবাদবাংলাদেশদিল্লি-ঢাকার সম্পর্কে টানাপড়েন, তবু সংস্কৃতির সেতু মজবুত করতে বাংলাদেশের নতুন বার্তা

দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কে টানাপড়েন, তবু সংস্কৃতির সেতু মজবুত করতে বাংলাদেশের নতুন বার্তা

নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত দুই বাংলার মানুষের কাছেই বিশেষ আবেগের বিষয়। ফলে এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নিউজবাংলা ডেস্ক : ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন পুরোপুরি কাটেনি। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যেই সম্পর্কের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—সংস্কৃতি—নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিল ঢাকা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধুমাত্র দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে ‘আত্মার সম্পর্ক’।

তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের গভীর যোগসূত্রের কথা। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী রবিবার বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রায় এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতে সেই যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মও উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় দূতাবাসের তরফে জানানো হয়েছে, দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও মসৃণ ও কার্যকর করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ নয়, ভবিষ্যতে একাধিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি এবং সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে বছরজুড়ে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত দুই বাংলার মানুষের কাছেই বিশেষ আবেগের বিষয়। ফলে এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বৈঠকে শাস্ত্রীয় সংগীত, লোকশিল্প, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয় উঠে আসে। ভারতের নজরুল গবেষক, শিল্পী এবং সংস্কৃতিবিদদের বাংলাদেশে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী।

এর ফলে নজরুলচর্চাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সাংস্কৃতিক মহলের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অন্যতম বড় ক্ষেত্র সংগীত। দুই দেশেই শাস্ত্রীয় সংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই জায়গাটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।

তিনি দুই দেশের মধ্যে শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে শিল্পী, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের শিল্পীদের যৌথ অনুষ্ঠান, কর্মশালা, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ আরও বাড়বে।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে ‘আত্মার সম্পর্ক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার পিছনে রয়েছে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। সীমান্ত রাজনৈতিকভাবে দুই দেশকে আলাদা করলেও ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে বহু মিল রয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরীর বক্তব্য, দুই দেশের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে গভীর সেতুবন্ধন রয়েছে। তাঁর মতে, এই সাংস্কৃতিক বন্ধনই ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

অর্থাৎ রাজনৈতিক স্তরে মতবিরোধ থাকলেও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানকে সম্পর্কের একটি আলাদা সেতু হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে আলোচনায় এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়।

তবে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্য ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে চাপানউতর তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টিও এখনও স্পষ্ট নয়।

এই পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সংস্কৃতি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরেও দুই দেশের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা যায়।

বৈঠকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সম্মেলন, সংগীতানুষ্ঠান, লোকশিল্পের প্রদর্শনী, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলি একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

বিশেষ করে নজরুলকে ঘিরে গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও সামনে আনতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের কাছেও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক সাধারণত রাজনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচিত হয়। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি সংস্কৃতি। এই জায়গায় সহযোগিতা বাড়লে রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।

ঢাকার সাম্প্রতিক বার্তা সেই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে মতপার্থক্য রয়েছে, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে বাংলাদেশ।

ফলে আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি কতটা কার্যকর সেতু হয়ে উঠতে পারে, সেটাই এখন দেখার। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকেই যাক, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকঐতিহ্যের যে দীর্ঘ সম্পর্ক দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে সহযোগিতার দরজা খোলার চেষ্টা যে শুরু হয়েছে, সাম্প্রতিক বৈঠক তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ