বর্ষাকাল এলেই খাবারবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সময় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং, পেটের সংক্রমণসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বাইরে থেকে অনেক খাবারই একেবারে টাটকা মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধু চোখে দেখে বা গন্ধ শুঁকে সেই পরিবর্তন বুঝে ওঠা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
এই সমস্যার সমাধানেই বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন অত্যাধুনিক ‘ডিজিটাল নাক’ (Digital Nose)। বিশেষ সেন্সরযুক্ত এই প্রযুক্তি খাবারের গন্ধ বিশ্লেষণ করে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জানিয়ে দিতে পারবে খাবারটি নিরাপদ কি না, তাতে ক্ষতিকর জীবাণু রয়েছে কি না কিংবা তা খেলে অ্যালার্জি বা বিষক্রিয়ার আশঙ্কা আছে কি না।
ডিজিটাল নাক হলো এমন একটি স্মার্ট ডিভাইস, যা মানুষের ঘ্রাণশক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে খাবারের ভেতরে চলতে থাকা রাসায়নিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে সক্ষম। এতে অত্যন্ত সংবেদনশীল একাধিক সেন্সর এবং ক্ষুদ্র চিপ ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিভিন্ন ধরনের গ্যাস, জৈব যৌগ এবং রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করতে পারে।
বাইরে থেকে খাবার যতই সতেজ দেখাক না কেন, ভেতরে পচন ধরেছে কি না বা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে কি না—সেটি এই প্রযুক্তি দ্রুত শনাক্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এই অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে এটি স্মার্টফোন, ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য স্মার্ট হোম ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।
ডিজিটাল নাকের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য বিশেষায়িত সেন্সর। কোনো খাবারের ওপর এই ডিভাইসটি ধরলেই সেন্সরগুলো সেই খাবার থেকে নির্গত গ্যাস ও রাসায়নিক যৌগ শনাক্ত করে।
খাবার নষ্ট হতে শুরু করলে সেখান থেকে নির্দিষ্ট ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compounds বা VOCs) বের হয়। মানুষের নাক সাধারণত এত সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে পারে না। কিন্তু ডিজিটাল নাক সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে দ্রুত বুঝে যায় খাবারটি নিরাপদ রয়েছে কি না।
একই সঙ্গে এটি খাবারের ভেতরে চলমান রাসায়নিক বিক্রিয়াও বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে কোনো খাবারে অতিরিক্ত রাসায়নিক, ক্ষতিকর উপাদান বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটলে সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
অনেক সময় বাজার থেকে কেনা মাছ, মাংস, ফল বা সবজি দেখতে একেবারে সতেজ মনে হয়। কিন্তু সংরক্ষণের ত্রুটি বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার কারণে সেগুলোতে জীবাণুর সংক্রমণ শুরু হয়ে যেতে পারে।
ডিজিটাল নাক সেই ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করবে। ফলে খাবার খাওয়ার আগে ব্যবহারকারী জানতে পারবেন সেটি নিরাপদ কি না।
এতে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
অনেক সময় খাবারকে দীর্ঘদিন টাটকা দেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রিজারভেটিভ বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বাইরে থেকে দেখে সেই খাবার ভালো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ডিজিটাল নাকের সেন্সর এমন রাসায়নিক পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে কৃত্রিমভাবে সতেজ দেখানোর চেষ্টা করা হলেও এই প্রযুক্তির চোখ ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হলো, ভবিষ্যতে রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত খাবারের নিরাপত্তাও সহজে যাচাই করা যাবে।
খাবারের ওপর ডিভাইসটি ব্যবহার করলেই বোঝা যাবে সেটি খাওয়ার উপযোগী কি না। এতে গ্রাহকেরা আরও নিশ্চিন্তে খাবার গ্রহণ করতে পারবেন এবং খাদ্য নিরাপত্তার মানও বাড়বে।
অনেকেই রান্না করা খাবার, মাছ বা মাংস দীর্ঘদিন ফ্রিজে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু সব সময় বোঝা যায় না সেগুলো এখনও নিরাপদ রয়েছে কি না।
ডিজিটাল নাক কয়েক সেকেন্ডেই জানিয়ে দিতে পারবে—
- খাবারে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়েছে কি না।
- খাবার পচতে শুরু করেছে কি না।
- দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কারণে মান নষ্ট হয়েছে কি না।
- খেলে পেটের সমস্যা বা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি না।
ফলে অজান্তেই নষ্ট খাবার খাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।
সব মানুষের শরীর এক ধরনের খাবারে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। অনেকের নির্দিষ্ট রাসায়নিক বা খাদ্য উপাদানে অ্যালার্জি হয়।
গবেষকদের দাবি, ভবিষ্যতে ডিজিটাল নাক এমন পর্যায়ে উন্নত করা হবে যাতে এটি খাবারের এমন উপাদানও শনাক্ত করতে পারে, যা নির্দিষ্ট ব্যক্তির অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
এটি খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
গবেষকদের মতে, ডিজিটাল নাকের ব্যবহার শুধু খাদ্য পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের শরীর বা নিঃশ্বাস থেকে নির্গত বিশেষ গন্ধ বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করার প্রযুক্তির সঙ্গেও এটি যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
অনেক রোগ শরীরে নির্দিষ্ট ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়, যার ফলে বিশেষ গন্ধ তৈরি হয়। ডিজিটাল নাক সেই পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারলে রোগ নির্ণয় আরও দ্রুত এবং নির্ভুল হতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নষ্ট খাবার, ভেজাল, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিদিনই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল নাক প্রযুক্তি মানুষের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হতে পারে। এটি শুধু খাবার নিরাপদ কি না তা জানাবে না, বরং খাদ্য অপচয় কমানো, স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট কিচেন প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে খুব শিগগিরই এমন দিন আসতে পারে, যখন খাবার খাওয়ার আগে মানুষের নাকের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত নেবে একটি ছোট্ট স্মার্ট ডিজিটাল নাক।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

