Become a member

Get the best offers and updates relating to Newsbangla24x7.com

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভমানুষ কি ১৭ লক্ষ বছর আগেই আগুন ব্যবহার করত? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর...

মানুষ কি ১৭ লক্ষ বছর আগেই আগুন ব্যবহার করত? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর দাবি!

গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব নিদর্শন ইঙ্গিত দেয় যে প্রায় ১০ লাখ বছর আগে ওই গুহার বাসিন্দারা আগুন ব্যবহার করত। উদ্ধার হওয়া উপকরণগুলোর অবস্থা এবং রাসায়নিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

সভ্যতার বিকাশে আগুনের আবিষ্কার ও ব্যবহার মানবজাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। আগুন শুধু খাদ্য রান্নার সুযোগই সৃষ্টি করেনি, বরং শীত থেকে সুরক্ষা, বন্য প্রাণীর আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সামাজিক জীবন গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে আদিম মানব ঠিক কখন প্রথম আগুন ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা সেই ধারণাকে আরও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে। ধারণা করা হতো, আগুন জ্বালানোর কৌশলও তারা বা তাদের নিকটবর্তী পূর্বসূরিরা আয়ত্ত করেছিল। তবে নতুন গবেষণা বলছে, আগুনের ব্যবহার শুরু হয়েছিল তারও বহু আগে, সম্ভবত ১০ লাখ থেকে ১৭ লাখ বছর পূর্বে।

এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আধুনিক মানুষের পূর্ববর্তী আদিম মানবগোষ্ঠী প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আগুনকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করত। যদিও তারা নিজেরা আগুন সৃষ্টি করতে পারত কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের মতে, আদিম মানব প্রথমদিকে আগুন জ্বালাতে সক্ষম ছিল না। বজ্রপাত, দাবানল কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট আগুন সংগ্রহ করে তারা তা ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে আগুন সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল তারা আয়ত্ত করে।

এর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল যে, আদিম মানব প্রায় চার লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই সময়সীমাকে আরও কয়েক লক্ষ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, আগুনের ব্যবহার অন্তত ১০ লাখ বছর আগেই শুরু হয়েছিল এবং এর কিছু প্রমাণ ১৭ লাখ বছর পুরোনো।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ওয়ান্ডারওয়ার্ক গুহায় দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালানো হয়েছে। এই অনুসন্ধানে উদ্ধার করা হয়েছে পোড়া হাড়, দগ্ধ পাথরের তৈরি অস্ত্র এবং আগুনের উপস্থিতির ইঙ্গিত বহনকারী বিভিন্ন উপাদান।

গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব নিদর্শন ইঙ্গিত দেয় যে প্রায় ১০ লাখ বছর আগে ওই গুহার বাসিন্দারা আগুন ব্যবহার করত। উদ্ধার হওয়া উপকরণগুলোর অবস্থা এবং রাসায়নিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী প্লস ওয়ান-এ। গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক ‘বোন লুমিনেসেন্স’ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রাচীন হাড় ও জীবাশ্মে আগুনের প্রভাব শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

এই পরীক্ষায় হাড়ের ওপর বিশেষ ধরনের উজ্জ্বল নীল আলো প্রয়োগ করা হয়। এরপর অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে হাড়ের অভ্যন্তরীণ গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। যদি হাড় আগুনে পুড়ে থাকে, তবে তা বিশেষ ফিল্টারে উজ্জ্বল লাল আভা প্রদর্শন করে।

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা নিশ্চিত হন যে উদ্ধার হওয়া অনেক হাড়ই অতীতে আগুনের সংস্পর্শে এসেছিল।

পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা নমুনাগুলোর মধ্যে কিছু হাড়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার বছর এবং কিছু নমুনার বয়স প্রায় ১৭ লাখ বছর।

বর্তমানে এই নিদর্শনগুলোকে মানব ইতিহাসে আগুন ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে এত পুরোনো সময়ের আগুন ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল না।

এই আবিষ্কার মানব বিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইতিহাসকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—উদ্ধার হওয়া পোড়া হাড়গুলো কি সত্যিই মানুষের ব্যবহৃত আগুনের ফল, নাকি প্রাকৃতিক দাবানলের কারণে পুড়ে গিয়েছিল?

গবেষকরা এই প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, পোড়া হাড় ও অন্যান্য নিদর্শন গুহার প্রবেশপথ থেকে প্রায় ৩০ মিটার ভেতরে পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক দাবানলের আগুন এত গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

এই অবস্থানগত তথ্য গবেষকদের বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, গুহার বাসিন্দারাই সচেতনভাবে আগুন ব্যবহার করেছিল।

আগুনের ব্যবহার মানব বিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লবী পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। রান্না করা খাদ্য সহজপাচ্য হওয়ায় মানুষের পুষ্টিগত উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে শীতপ্রধান পরিবেশে টিকে থাকা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও আগুন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নতুন গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করে যে, আদিম মানবের জ্ঞান ও অভিযোজন ক্ষমতা আমাদের পূর্বধারণার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত ছিল। তারা হয়তো আগুন সৃষ্টি করতে পারত না, কিন্তু প্রাকৃতিক আগুনকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর দক্ষতা অর্জন করেছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ান্ডারওয়ার্ক গুহা থেকে পাওয়া নতুন প্রমাণ মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। আগুনের ব্যবহার যে আধুনিক মানুষের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও আগুন আবিষ্কারের সঠিক সময় এখনও রহস্যাবৃত, তবে এই গবেষণা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে যে আদিম মানবের জীবনযাত্রা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের আরও গবেষণা হয়তো মানবজাতির এই অসাধারণ অর্জনের ইতিহাসকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচন করবে।