বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর আগেই বড় বিতর্ক
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপকে ঘিরে সাধারণত উৎসবের আবহ তৈরি হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই একের পর এক বিতর্ক আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড়, রাজনৈতিক নেতা এবং সমর্থকদের একটি বড় অংশ এই ঘটনাকে বিশ্বকাপের চেতনার পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, এটি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম বিব্রতকর অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
সোমালি রেফারির স্বপ্নভঙ্গ
আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি হিসেবে পরিচিত ওমর আরতান বিশ্বকাপ ২০২৬-এ দায়িত্ব পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু মিয়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়।
এরপর কয়েক ঘণ্টা একটি আটক কক্ষে রাখা হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে তুরস্কগামী একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্বকাপে রেফারিং করার বহুদিনের স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়।
আরতান দাবি করেন, তার কাছে বৈধ ভিসা এবং সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছিল। তবুও তাকে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত হতাশ। আমি শুধু একজন রেফারি, যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। আমার কাছে সঠিক ভিসা ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছিল।”
‘আমার দেশের কারণেই সমস্যা’
ঘটনার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আরতান জানান, তিনি মনে করেন তার দেশের পরিচয়ই এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তার ভাষায়, “আমার মনে হয় তাদের সমস্যা আমার দেশের সঙ্গে।”
এই মন্তব্যের পর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে। কারণ সোমালিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা নীতির আওতায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।
সোমালিয়ার প্রধানমন্ত্রীর তীব্র প্রতিক্রিয়া
ওমর আরতানের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সোমালিয়ার প্রধানমন্ত্রী Hassan Ali Khaire।
তিনি বলেন, “আমি গভীরভাবে হতাশ যে আফ্রিকার অন্যতম সেরা এবং বিশ্বের শীর্ষ রেফারিদের একজন ওমর আরতান ভিসা-সংক্রান্ত পরিস্থিতির কারণে বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।”
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আরতান তার প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম, পেশাদারিত্ব এবং সততার মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি শুধু সোমালিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং লক্ষ লক্ষ আফ্রিকান তরুণের স্বপ্নের প্রতীক।
তার মতে, ফুটবলের মূল শক্তি মানুষকে একত্রিত করা এবং যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। সেই আদর্শের সঙ্গে এই ঘটনা সাংঘর্ষিক।
ফুটবল মহলে ক্ষোভ
ঘটনার পরপরই ফুটবল বিশ্বের অনেক পরিচিত মুখ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাবেক ইংল্যান্ড ও আর্সেনাল তারকা Ian Wright সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রায় প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর নতুন কোনো বিতর্ক সামনে আসছে।
তার অভিযোগ, কখনও সমর্থক, কখনও খেলোয়াড়, কখনও সাংবাদিক, আবার কখনও কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে রেফারির নামও।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশ কি এভাবেই আচরণ করে?”
‘বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ’ আখ্যা
ইয়ান রাইট আরও বলেন, এই পরিস্থিতি বিশ্বকাপের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তার মতে, “এটি সত্যিই এক বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ। যে দলই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতুক না কেন, তাদেরকে এই বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।”
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে এমন ঘটনাগুলো ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মার্টিন লুথার কিংয়ের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
Paul Canoville, যিনি চেলসির ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত, এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, “এটা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। কীভাবে বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন রেফারিকে শুধু তিনি সোমালি এবং আফ্রিকান হওয়ার কারণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়?”
ক্যানোভিলের মতে, এমন পরিস্থিতি বৈষম্য এবং বিভেদের আশঙ্কা বাড়ায়। তিনি আরও বলেন, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি Martin Luther King Jr. আজ বেঁচে থাকলে এমন ঘটনা দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হতেন।
ইরানের টিকিট বিতর্কও বাড়াচ্ছে চাপ
বিশ্বকাপকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক দেখা দিয়েছে ইরানের সমর্থকদের টিকিট বরাদ্দ নিয়ে। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, তাদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।
ইরানের ফুটবল কর্তৃপক্ষের মতে, এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতির বিরুদ্ধে যায়। ফলে বিশ্বকাপ আয়োজকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
নিরাপত্তা তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থার বাড়তি তৎপরতার খবরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে সেনেগালের খেলোয়াড়দের আগমনের সময় বিস্তারিত ব্যাগ তল্লাশি করা হয়েছে। অন্যদিকে উজবেকিস্তান দলের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনার ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বিশ্বকাপ কি সত্যিই সকল দেশের জন্য সমান সুযোগ ও স্বাগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে?
ফিফার অবস্থান
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FIFA নিশ্চিত করেছে যে ওমর আরতান বিশ্বকাপ ২০২৬-এ রেফারির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো দেশের ভিসা প্রদান বা অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ফিফার সরাসরি ভূমিকা নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের হাতে থাকে।
ফিফা আরও জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরতানের অভিবাসন অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
বিশ্বকাপের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হওয়ার আগেই একের পর এক বিতর্ক ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়েছে। সোমালি রেফারি ওমর আরতানের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা, ইরানের টিকিট ইস্যু, বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশি—সব মিলিয়ে আয়োজকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে ঐক্য, বৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেকের কাছে সেই আদর্শকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার আগেই তাই আলোচনার কেন্দ্রে খেলা নয়, বরং বিতর্ক এবং অনিশ্চয়তা।

