সর্বাধিক পঠিত

spot_img

সর্বশেষ আপডেট...

Homeবিশেষ প্রতিবেদনরূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেরি হচ্ছে কেন, কবে মিলবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ?

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেরি হচ্ছে কেন, কবে মিলবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ?

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেরি হওয়া নিয়ে মানুষের হতাশা বা প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুত উৎপাদন শুরু করার চেয়ে প্রতিটি পরীক্ষা নির্ভুলভাবে শেষ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজবাংলা ডেস্ক : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার সময় আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও সেই লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা এখন আর স্পষ্ট নয়। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা যন্ত্রের পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। এ খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে ব্যবহৃত পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা পিওআরভির পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। দুটি সেফটি ভালভ ঠিকভাবে কাজ না করায় পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে যাওয়া আটকে আছে। ফলে চলতি বছরেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে কি না, তা নিয়েও এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

যে যন্ত্রের সমস্যায় আটকে গেছে পরীক্ষা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে অনেকগুলো ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এর প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো শুধু যন্ত্র চালু করলেই উৎপাদন শুরু করা যায় না। চুল্লির তাপমাত্রা, চাপ, পানির প্রবাহ, কুলিং ব্যবস্থা এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হয়।

বর্তমান জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা পিওআরভি। এটি চুল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এই ভালভের কার্যকারিতা পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, রূপপুরে ভালভসংক্রান্ত সমস্যাটি ছিল অপ্রত্যাশিত। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি ও রুশ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছেন। এমনকি রোসাটমের প্রধান ডিজাইনারও সমস্যা পর্যালোচনায় রূপপুরে এসেছেন।

সেফটি ভালভ আসলে কী কাজ করে?

বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে সেফটি ভালভের কাজ কী। পারমাণবিক চুল্লির ভেতরে নির্দিষ্ট মাত্রায় তাপ ও চাপ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ বা প্রেসারাইজার সেফটি রিলিফ ভালভ সাধারণত চুল্লির প্রাথমিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা।

চুল্লির ভেতরের চাপ নির্ধারিত সীমার ওপরে চলে গেলে ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাওয়ার কথা। তখন উচ্চচাপের বাষ্প একটি নির্দিষ্ট রিলিফ ট্যাংকের দিকে চলে যায়। এতে সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে আসে। চাপ নিরাপদ মাত্রায় ফিরে এলে ভালভ আবার বন্ধ হয়ে যায়।

অর্থাৎ, পুরো ব্যবস্থাটি অনেকটা স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা দরজার মতো। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দরজাটি বন্ধ থাকে। কিন্তু ভেতরে চাপ বিপজ্জনক পর্যায়ে গেলে সেটি নিজে থেকে খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার কথা।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে এমন দুটি ভালভ পরীক্ষার সময় প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না। আর এ কারণেই পরবর্তী পরীক্ষার ধাপ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এই ভালভকে?

পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শফিকুল ইসলামের মতে, সেফটি ভালভ রিঅ্যাক্টর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চুল্লির তাপমাত্রা ও পানির প্রবাহের সঙ্গে চাপের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো কারণে চাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ না করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেন। তার মতে, নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো যন্ত্র শতভাগ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ধাপে যাওয়া উচিত নয়।

এই ধরনের ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনার উদাহরণও সামনে আসে। ওই ঘটনায় একটি পিওআরভি খোলা অবস্থায় আটকে গিয়ে প্রাথমিক কুল্যান্ট বের হতে থাকে। দুর্ঘটনার শুরুর দিকে অপারেটররা ভালভটির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাননি।

রূপপুরে ব্যবহৃত ভিভিআর-১২০০ ডিজাইনে নিরাপত্তা বাড়াতে একাধিক ভালভের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ড. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি প্রধান ভালভের পাশাপাশি আরও দুটি ভালভ বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করার কথা। ফলে একটি ব্যবস্থায় সমস্যা হলেও অন্যগুলো অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে।

চাপ ও পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কীভাবে কাজ করে?

পারমাণবিক চুল্লির প্রাথমিক কুলিং সিস্টেমে পানির প্রবাহ এবং চাপের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসারাইজারের কাজ হলো সিস্টেমের চাপ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা।

চাপ কমে গেলে সেটি বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকে। আবার চাপ বেড়ে গেলে তা কমিয়ে আনার প্রয়োজন হয়। অতিরিক্ত চাপ বা বাষ্প তৈরি হলে সেটি নির্দিষ্ট পথে বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে রিলিফ ভালভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হওয়ার কথা। কিন্তু ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলতে না পারলে পরীক্ষার পরবর্তী ধাপে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

রূপপুরের বর্তমান সমস্যাটিও মূলত এখানেই। পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও চাপের পরিস্থিতিতে ভালভ প্রত্যাশিতভাবে খুলছে না। মেরামতের পরও একই পরীক্ষা সফল হয়নি বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন।

সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে?

এখন মূল লক্ষ্য হলো সমস্যাগ্রস্ত ভালভগুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে সচল করা এবং পরবর্তী পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা। সংশ্লিষ্ট যন্ত্র মেরামত করে কাজ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নতুন ভালভ প্রস্তুত করে আনার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে এটি সাধারণ কোনো যন্ত্রের মতো বাজার থেকে কিনে এনে দ্রুত বসিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নির্দিষ্ট নকশা ও মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি করতে হয়। ফলে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন হলে সময় লাগতে পারে।

ড. শফিকুল ইসলামের মতে, সমস্যাটি সমাধানের সময় নির্ভর করবে যন্ত্রটি মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে কি না, নাকি নতুন করে তৈরি করে আনতে হবে তার ওপর। নতুন যন্ত্র তৈরি ও স্থাপন করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় প্রয়োজন হবে।

শুধু ভালভ ঠিক হলেই কি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে?

না। বর্তমান ভালভের সমস্যা সমাধান হলেও রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না সঙ্গে সঙ্গেই। কারণ জ্বালানি লোডিংয়ের পর আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাকি রয়েছে।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক। কিন্তু তার পরের ধাপে রয়েছে ক্রিটিকালিটি টেস্টসহ নানা ধরনের পরীক্ষা। প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী ধাপে যেতে হয়।

পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল যাচাই করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমোদন দেবে। শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়েরও প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ একটি যন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে—এমন প্রাথমিক নিশ্চয়তা পেলেই পুরো কেন্দ্রকে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত ঘোষণা করা সম্ভব নয়।

সামনে আরও শত শত পরীক্ষা

জ্বালানি লোডিংয়ের পর কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করতে হয়। জেনারেটর, টারবাইন এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ও রয়েছে।

কেন্দ্র চালু থাকা অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাজ করবে, জরুরি পরিস্থিতিতে কোন সিস্টেম কীভাবে সক্রিয় হবে—এসবও পরীক্ষা করা হয়।

ড. শফিকুল ইসলামের মতে, এই ধরনের প্রকল্পে শত শত কঠিন ও জটিল পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। পরীক্ষার সময় কোনো সমস্যা ধরা পড়লে সেটি সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এ কারণেই রূপপুর থেকে নির্দিষ্ট দিনে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে—এমন ঘোষণা দেওয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ। একটি পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী ধাপের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

লাইসেন্স দেবে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ

রূপপুরের পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে।

সংস্থার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত বক্তব্য না এলেও জানানো হয়েছে, পরীক্ষার ফলাফল এবং সমস্যা সমাধানের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সবকিছু সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে উৎপাদন দ্রুত শুরু করার চাপ থাকতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেই চাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না।

রূপপুরে এর আগে অন্য দেশেও একই ডিজাইনের কেন্দ্র হয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুরে ব্যবহৃত প্রযুক্তির রেফারেন্স প্ল্যান্ট রাশিয়া ও বেলারুশে রয়েছে। ফলে এই ধরনের প্রযুক্তিতে সম্ভাব্য কারিগরি সমস্যা এবং তার সমাধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি লোডিংয়ের পর কোন পরীক্ষা কখন হবে, কোনো সমস্যায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যন্ত্রাংশের ত্রুটি হলে কার দায়িত্ব কী—এসব বিষয় লিখিতভাবে নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিলম্বের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না, সেটিও চুক্তিতে স্পষ্ট থাকা দরকার।

তবে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইউনিট কমিশনিং শিডিউল’ চুক্তি বাংলাদেশে আছে কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি।

তাহলে কবে মিলবে রূপপুরের বিদ্যুৎ?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই। কিন্তু এর নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারছেন না সরকার বা বিশেষজ্ঞরা।

প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর ৯০টির বেশি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, জ্বালানি লোডিংয়ের পর ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে প্রায় ১০ মাসের মতো সময় লাগতে পারে।

তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নয়। প্রতিটি পরীক্ষা সফল হওয়ার ওপর পরবর্তী ধাপ নির্ভর করে। ফলে বর্তমান ভালভের সমস্যার সমাধান কত দ্রুত হচ্ছে, পরবর্তী পরীক্ষায় নতুন কোনো ত্রুটি ধরা পড়ছে কি না এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা কখন অনুমোদন দিচ্ছে—সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত সময় নির্ধারিত হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীও বলেছেন, পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও সিকিউরিটিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ করার সুযোগ নেই। প্রকৌশলী ও রুশ বিশেষজ্ঞরা সমস্যার সমাধানে কাজ করছেন।

কেন নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করতে চাইছে না সরকার?

কারণ পারমাণবিক প্রকল্পে একটি ধাপের সঙ্গে আরেকটি ধাপ সরাসরি যুক্ত। কোনো একটি পরীক্ষায় সমস্যা হলে পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়াই পিছিয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সব পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে নির্দিষ্ট মাস ঘোষণা করা হলে পরে সেটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। এতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে এগোনোকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছতা চান বিশেষজ্ঞরা

রূপপুর প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি, পরীক্ষা, সমস্যা এবং সমাধান সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য না পাওয়ায় নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ড. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, প্রকল্পের জন্য একটি নিয়মিত মিডিয়া সেল থাকলে বিষয়টি আরও সহজভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা যেত। দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নিয়মিত গণমাধ্যমকে তথ্য দিলে অথবা ওয়েবসাইটে ধারাবাহিকভাবে আপডেট দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা বুঝতে পারত।

তার মতে, প্রকল্প যত বিলম্বিত হয়, মানুষের উদ্বেগ ও প্রশ্ন তত বাড়ে। নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করলে এ ধরনের উদ্বেগ কিছুটা কমানো সম্ভব।

রূপপুর প্রকল্পের বড় প্রত্যাশা

রাশিয়ার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা এবং জ্বালানি ব্যয়ের বাস্তবতায় রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলে জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ খাতেও একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হবে।

কিন্তু সেই পরিবর্তনের আগে সবচেয়ে জরুরি হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেরি হওয়া নিয়ে মানুষের হতাশা বা প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুত উৎপাদন শুরু করার চেয়ে প্রতিটি পরীক্ষা নির্ভুলভাবে শেষ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই নির্দিষ্ট তারিখের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি বিষয়—প্রথম ইউনিটের প্রতিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর কি না। পিওআরভি বা সেফটি ভালভের সমস্যার সমাধান, পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা এবং সবশেষে লাইসেন্স—এই পুরো প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাওয়ার পথ খুলবে।

অর্থাৎ, রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেরির মূল কারণ শুধু একটি যন্ত্রের ত্রুটি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারমাণবিক কেন্দ্রের কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং একাধিক ধাপে সফলভাবে কমিশনিং সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা।

তাই এখনই নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই বাস্তবসম্মত। কারণ রূপপুরের ক্ষেত্রে কয়েক মাসের বিলম্বের চেয়ে নিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও অনেক বড় বিষয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ