বিনোদন ডেস্ক : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়নি। বরং বছর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঘিরে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। চিত্রনায়ক সালমান শাহ সেই বিরল তালিকার অন্যতম নাম। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবন, ২৭টি সিনেমা এবং মাত্র ২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু—এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি এমন এক দর্শকপ্রিয়তা তৈরি করেছিলেন, যা তিন দশক পরও টিকে আছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুর পর কেটে গেছে প্রায় ৩০ বছর। এর মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এসেছে একাধিক প্রজন্ম, বদলেছে দর্শকের রুচি, বদলেছে সিনেমা দেখার মাধ্যমও। একসময় মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে যে নায়ককে দেখত, এখন তার অনেক সিনেমাই নতুন প্রজন্ম ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে দেখছে। তারপরও সালমান শাহর প্রতি আগ্রহ কমেনি।
বরং এমন তরুণ-তরুণীও আছেন, যারা সালমান শাহকে জীবিত অবস্থায় কখনো দেখেননি। তার জন্মের কয়েক বছর পর কিংবা তার মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মও আজ তার অভিনয়, পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে আগ্রহী।
প্রশ্ন হলো, কেন?
অল্প সময়েই তৈরি হয়েছিল বিশাল জনপ্রিয়তা
সালমান শাহর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। ছবিটি মুক্তির পরই তিনি রাতারাতি দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সিনেমাটির সাফল্য তাকে শুধু জনপ্রিয় নায়কই বানায়নি, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের তরুণ দর্শকদের কাছে একটি নতুন ধরনের তারকা-ইমেজ তৈরি করেছিল।
এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করতে থাকেন তিনি। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ। তার অভিনীত অধিকাংশ সিনেমাই দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
তার অভিনয়ের মধ্যে ছিল স্বাভাবিকতা। সংলাপ বলার ধরন ছিল সাবলীল। পর্দায় তার উপস্থিতিতেও ছিল আলাদা আকর্ষণ। ফলে তিনি শুধু সিনেমার নায়ক ছিলেন না, দ্রুতই তরুণ প্রজন্মের জীবনযাপনের একটি অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
সেই সময় অনেক দর্শক তার পোশাক পরতেন, চুলের স্টাইল অনুসরণ করতেন। এমনকি তার হাঁটা, কথা বলা কিংবা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিও অনেকে নকল করতেন।
জন্মের নাম থেকে কীভাবে হলো ‘সালমান শাহ’
সালমান শাহর প্রকৃত নাম ছিল চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার। পরিবারের কাছে তার ডাকনাম ছিল ইমন। ১৯৭১ সালে সিলেটে নানাবাড়িতে তার জন্ম।
তার বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকরির কারণে পরিবারের বসবাস বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে। ছোটবেলায় কুমিল্লার একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় তার দীর্ঘ নাম নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
শিক্ষকদের পরামর্শে নামটি ছোট করার প্রয়োজন হয়। তখন তার নাম থেকে ‘সালমান’ অংশটি বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে সেই বাদ দেওয়া নামই যে তার পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে, তা তখন কেউ ভাবেননি।
চলচ্চিত্রে আসার সময় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার নামের সঙ্গে ‘সালমান’ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। ‘সালমান খান’ নাম রাখার কথাও আলোচনায় এসেছিল। পরে অন্য একজনের একই নাম থাকায় নতুন নাম খোঁজা হয়।
শেষ পর্যন্ত সালমান শাহ নামটি তৈরি হয়। তার মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর প্রতি তার ভালো লাগা এবং ছেলে সালমানের নামের মধ্যে থাকা ‘শাহরিয়ার’ শব্দ থেকে ‘শাহ’ অংশ নেওয়ার ধারণা আসে। সেখান থেকেই তৈরি হয় সেই নাম, যা পরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।
অভিনয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ছোটবেলাতেই
সালমান শাহ এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তার নানা কামরুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন।
অন্যদিকে তার মা নীলা চৌধুরী গান করতেন রেডিও ও টেলিভিশনে। মায়ের মাধ্যমেই ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় সালমান শাহর উপস্থিতি শুরু হয়।
শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করার পর তিনি বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। নাটকে অভিনয় করেন এবং বিভিন্ন বিজ্ঞাপনেও মডেল হিসেবে কাজ করেন।
তখন অভিনয়কে তিনি মূলত শখ হিসেবেই দেখতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই শখই তাকে চলচ্চিত্রের বড় পর্দায় নিয়ে যায়।
বড় পর্দায় আসার আগে ছিল আরেক গল্প
চলচ্চিত্রে সালমান শাহর যাত্রা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে জনপ্রিয় হলেও এর আগেও সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ এসেছিল।
খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ শুরু করেছিলেন। সেই ছবিতে রইস চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সালমান শাহ।
কিন্তু ১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সিনেমাটির কাজ শেষ হয়নি। ফলে সেই চলচ্চিত্র দর্শকের সামনে আর আসেনি।
এরপর আসে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ বদলে দেয় জীবন
বলিউডের ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ সিনেমার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও প্রভাব ফেলেছিল। অনুমোদন নিয়ে ছবিটির বাংলা সংস্করণ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড।
পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তখন নতুন মুখ খুঁজছিলেন। ১৯৯২ সালে সালমান শাহর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। প্রথমদিকে সালমানের পরিবার ছেলের চলচ্চিত্রে অভিনয় নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু সালমানের নিজের আগ্রহ এবং পরে পরিবারের সম্মতির ফলে তিনি সিনেমাটিতে অভিনয় করেন।
১৯৯৩ সালের মার্চে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তি পাওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আর সালমান শাহ হয়ে ওঠেন সময়ের অন্যতম আলোচিত তারকা।
তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
চার বছরে ২৭ সিনেমা
সালমান শাহর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো এর স্বল্প দৈর্ঘ্য। মাত্র চার বছরের মধ্যে তিনি ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন।
তার সিনেমাগুলোর বড় অংশ ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। ফলে প্রযোজকদের কাছে তার নাম হয়ে ওঠে আস্থার প্রতীক। দর্শক সালমান শাহর সিনেমা দেখতে হলে যাবে—এমন বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল চলচ্চিত্র অঙ্গনে।
তার জনপ্রিয়তার প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে, মৃত্যুর সময়ও তার হাতে বেশ কয়েকটি সিনেমা ছিল। কয়েকটি সিনেমার শুটিং চলছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুর পর এসব অসমাপ্ত সিনেমার কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছু ছবির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আবার কিছু ছবিতে সালমান শাহর মতো দেখতে তরুণদের ব্যবহার করে বাকি দৃশ্য ধারণের চেষ্টা করা হয়। কোথাও আবার নতুন নায়ক নিয়ে নতুন করে শুটিং করতে হয়।
১৯৯৬ সালের সেই সকাল
সালমান শাহর জীবন থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তখন তার বয়স মাত্র ২৫ বছর।
ঢাকার নিউ ইস্কাটনের একটি ভবনের ১১ তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী সামিরা হকের সঙ্গে থাকতেন তিনি। তার বাবা-মা থাকতেন গ্রিনরোড এলাকায়।
সেদিন সকালে বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে যান।
পরে খবর পেয়ে মা নীলা চৌধুরী স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা দেখতে পান, সালমান শাহ শোবার ঘরে পড়ে আছেন।
তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল।
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এফডিসিতে ভিড় করেন সহকর্মী, পরিচালক এবং অসংখ্য ভক্ত। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা মাত্র ২৫ বছরের একজন তরুণ নায়ক আর নেই।
পরে সিলেটে নিয়ে গিয়ে হযরত শাহজালালের মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকে ঘিরে শুরু হয় দীর্ঘ বিতর্ক
সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই এটি নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। মরদেহের বিভিন্ন চিহ্ন নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে পরে মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা হিসেবে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির কাছে। দাফনের পর কবর থেকে মরদেহ তুলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তও করা হয়।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। সেখানেও আত্মহত্যার আলামত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক জানিয়েছিলেন।
এরপরও বিতর্ক থামেনি।
তদন্ত হয়েছে একাধিকবার, প্রশ্নও রয়ে গেছে
১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়।
পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। পরে ২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় এক দশকের বেশি সময় পর ২০১৪ সালে কমিটি প্রতিবেদন দেয় এবং মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করে।
কিন্তু পরিবার তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি।
২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশে র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পরের বছর রাবেয়া সুলতানা রুবির একটি ভিডিও বক্তব্য নতুন করে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে আলোচনা তৈরি করে। তিনি হত্যার অভিযোগ তুললেও পরে সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন।
পরবর্তীতে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই। ২০২০ সালে সংস্থাটি প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানেও সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে এই সিদ্ধান্তও পরিবারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া হয়নি।
প্রায় তিন দশক পর আবার হত্যা মামলা
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আইনি ও সামাজিক আলোচনায় থাকলেও ২০২৫ সালে এটি নতুন মোড় নেয়। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণ করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়।
পরে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সাবেক শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ বাহাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবি এবং রেজভী আহম্মেদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলায় পেশাদারিত্ব বজায় রেখে প্রকৃত সত্য বের করার চেষ্টা চলছে।
অভিযুক্তদের কেউ কেউ অতীতে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে মামলার তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকেই এখন নজর রয়েছে।
তাহলে ৩০ বছর পরও সালমান শাহকে ভুলতে পারছে না মানুষ?
সালমান শাহর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও সময়ের তুলনায় আধুনিক উপস্থিতির সমন্বয়।
তার পোশাকের ধরন ছিল আলাদা। চুলের স্টাইল থেকে শুরু করে ঘড়ি পরার ধরন—সবকিছুই তরুণদের মধ্যে অনুসরণ করার প্রবণতা তৈরি করেছিল।
তার অভিনয়ও ছিল স্বাভাবিক। সংলাপ বলার সময় অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে তিনি অনেক ক্ষেত্রে সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গি ব্যবহার করতেন। ফলে চরিত্রগুলো দর্শকের কাছে বাস্তব মনে হতো।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই তার সিনেমা দেখছে শুধু পুরোনো সিনেমা হিসেবে নয়, বরং তার অভিনয় এবং ফ্যাশনকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মধ্যেও সালমান শাহর প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। তাদের কেউ তার অভিনয়ের প্রশংসা করেন, কেউ তার ফ্যাশন সেন্সের, আবার কেউ তার স্বাভাবিক সংলাপ বলার ধরনকে আলাদা করে দেখেন।
অর্থাৎ সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কেবল নস্টালজিয়ার মধ্যে আটকে নেই। নতুন প্রজন্মও তার মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পাচ্ছে, যা তাদের কাছে এখনও আধুনিক ও আকর্ষণীয়।
মৃত্যুর রহস্য কি জনপ্রিয়তাকে আরও দীর্ঘ করেছে?
চলচ্চিত্র পরিচালক ও গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সালমান শাহর অকাল ও বিতর্কিত মৃত্যু তার জনপ্রিয়তাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
স্বাভাবিকভাবে একজন তারকা মারা গেলে সময়ের সঙ্গে তার জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে। কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রশ্ন তাকে মানুষের আলোচনায় ধরে রেখেছে।
একদিকে রয়েছে তার অল্প সময়ের অসাধারণ সাফল্য, অন্যদিকে রয়েছে মাত্র ২৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক তদন্ত, পরিবারের আপত্তি, আদালতের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং নতুন করে দায়ের হওয়া হত্যা মামলা।
সবকিছু মিলিয়ে সালমান শাহকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন এক রহস্য, যার পূর্ণ সমাধান এখনও মানুষের কৌতূহল মেটাতে পারেনি।
কবরেও পৌঁছাচ্ছেন ভক্তরা
সালমান শাহর জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় প্রমাণ তার কবরকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ। সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজারের কাছে তার সমাধিস্থলে এখনও ভক্তরা যান।
দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। কেউ কেউ কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শুধু প্রিয় নায়কের কবর দেখতে যান।
এটি প্রমাণ করে, সালমান শাহর সঙ্গে অনেক মানুষের সম্পর্ক কেবল সিনেমা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার ব্যক্তিত্ব ও পর্দার উপস্থিতি দর্শকের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছিল।
একটি প্রজন্মের নায়ক, একাধিক প্রজন্মের আইকন
সালমান শাহকে যারা নব্বইয়ের দশকে দেখেছেন, তাদের কাছে তিনি স্মৃতির অংশ। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি আবার নতুনভাবে আবিষ্কৃত একজন তারকা।
জেন-জি প্রজন্মের দর্শকেরাও তার সিনেমা দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে পুরোনো সিনেমা এখন সহজেই নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
ফলে সালমান শাহর মতো তারকারা নতুন করে আলোচনায় আসার সুযোগ পাচ্ছেন।
তার চার বছরের চলচ্চিত্রজীবন হয়তো খুব ছোট ছিল। কিন্তু সেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যে ছাপ রেখে গেছেন, তা মুছে যায়নি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন নায়ক এসেছেন, অনেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন। কিন্তু সালমান শাহর মতো করে ফ্যাশন, অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং দর্শকের আবেগকে একসঙ্গে প্রভাবিত করা তারকা খুব বেশি দেখা যায়নি।
এখনও কেন ‘সালমান শাহ’ আলাদা?
তিন দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও সালমান শাহকে নিয়ে আলোচনা থামেনি। এর পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছে। তার অসাধারণ জনপ্রিয়তা, স্বল্পস্থায়ী ক্যারিয়ার, তরুণ বয়সে মৃত্যু, ফ্যাশন ও অভিনয়ে নিজস্বতা এবং মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক বিতর্ক—সবকিছু মিলেই তাকে আলাদা করে তুলেছে।
একজন ভক্তের কাছে সালমান শাহ হয়তো প্রিয় নায়ক। কারও কাছে তিনি নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি। আবার নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি হতে পারেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি তার সময়ের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সিনেমা বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু সালমান শাহর জনপ্রিয়তা এখনও টিকে আছে।
তার মৃত্যুর তিন দশক পরও যদি তরুণরা তার পোশাক অনুসরণ করে, তার সিনেমা দেখে, তার অভিনয় নিয়ে কথা বলে এবং তার কবর জিয়ারত করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে যায়, তাহলে এটুকু বলা যায়—সালমান শাহ শুধু একটি সময়ের নায়ক ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতির এমন এক অংশে পরিণত হয়েছেন, যেখানে সময়ের হিসাব অনেকটাই অকার্যকর।
তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সত্য কী, সেটি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের ফলই শেষ কথা বলবে। কিন্তু তার শিল্পীসত্তা ও জনপ্রিয়তার জায়গাটি ইতোমধ্যে ইতিহাসে তৈরি হয়ে গেছে।
মাত্র ২৫ বছরের জীবন এবং চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার হয়েও সালমান শাহ যে জায়গা তৈরি করেছেন, তা আজও পূরণ হয়নি। এ কারণেই হয়তো তিন দশক পরও তার নাম উচ্চারিত হলে একই সঙ্গে ফিরে আসে স্মৃতি, আবেগ, ভালোবাসা আর এক অমীমাংসিত প্রশ্ন—এত অল্প সময়ে একজন মানুষ কীভাবে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন?
সূত্র: বিবিসি বাংলা।




