খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালব্রাজিলের লজ্জার হার! হালান্ডের সামনে অসহায় সেলেকাও, কোয়ার্টারে নরওয়ে

ব্রাজিলের লজ্জার হার! হালান্ডের সামনে অসহায় সেলেকাও, কোয়ার্টারে নরওয়ে

মাঠে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছিলেন। তিনি চাইলে শট নিতে পারতেন। নিয়মিত পেনাল্টি নেওয়া রাফিনহা এবং লুকাস পাকেতা চোটে না থাকলেও বিকল্প হিসেবে আরও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের ব্যবহার করা যেত।

হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নভঙ্গ, কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে: দিশাহীন সেলেকাওদের হতাশাজনক বিদায়

বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদ পেল ব্রাজিল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল দলটি এবার বিদায় নিল শেষ ষোলোর লড়াই থেকেই। আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে। ম্যাচজুড়ে আধিপত্য, সংগঠিত ফুটবল এবং কার্যকর আক্রমণে প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি ছাপিয়ে গেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা। অন্যদিকে ব্রাজিল খেলেছে আত্মবিশ্বাসহীন, ছন্দহীন এবং পরিকল্পনাহীন ফুটবল।

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ব্রাজিলের খেলায় দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছিল। গ্রুপ পর্বে মরক্কো এবং পরে জাপানের বিপক্ষে সেই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু কোচ কার্লো আনচেলোত্তির দল সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি। শক্তিশালী নরওয়ের বিপক্ষে সেই ব্যর্থতারই চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

ম্যাচের দুই গোলই করেন আর্লিং হালান্ড। তাঁর প্রথম গোলটি আসে দুর্দান্ত এক হেড থেকে। ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে সহজেই বল জালে পাঠান তিনি। দ্বিতীয় গোলটি ছিল আরও দৃষ্টিনন্দন। তিনজন ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে নিচু শটে গোল করে ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নির্ধারণ করে দেন নরওয়ের এই তারকা স্ট্রাইকার।

এই দুই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা সাতে নিয়ে যান হালান্ড। গোলদাতার তালিকায় তিনি এখন শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে রয়েছেন।

পুরো ম্যাচে নরওয়ে ছিল অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও নিয়ন্ত্রিত। বল দখল, পাসিং, আক্রমণ তৈরি—সব দিকেই তারা এগিয়ে ছিল। ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল নরওয়ে। ব্রাজিলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পাস সম্পন্ন করে তারা।

অন্যদিকে ব্রাজিলের ফুটবলে ছিল না কোনও গতি কিংবা আগ্রাসন। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও তারা নিজেদের অর্ধেই বেশি সময় কাটিয়েছে। আক্রমণে ওঠার পরিবর্তে নিরাপদ পাস খেলতেই যেন বেশি আগ্রহী ছিল।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন নিষ্প্রাণ পারফরম্যান্স ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়।

বিশ্বকাপে কিংবদন্তি হয়ে উঠতে হলে বড় ম্যাচে নিজের সেরাটা দিতে হয়। আর্লিং হালান্ড সেটিই করে দেখালেন।

ম্যাচজুড়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল ভয়ঙ্কর। শারীরিক শক্তি, গতি, অবস্থান নির্বাচন এবং ফিনিশিং—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অসাধারণ। প্রতিটি আক্রমণে ব্রাজিলের রক্ষণকে চাপে রেখেছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে অংশ নেন হালান্ড। তাঁর আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে, আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে থাকবেন তিনি।

ব্রাজিল ম্যাচে দুটি পেনাল্টি পেলেও প্রথম সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি। ব্রুনো গিমারায়েসের দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক অর্জান নাইল্যান্ড।

প্রশ্ন উঠেছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কেন ব্রুনোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল?

মাঠে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছিলেন। তিনি চাইলে শট নিতে পারতেন। নিয়মিত পেনাল্টি নেওয়া রাফিনহা এবং লুকাস পাকেতা চোটে না থাকলেও বিকল্প হিসেবে আরও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের ব্যবহার করা যেত।

এই সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের বিপক্ষে যায়।

৬৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেমার। ম্যাচে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি তিনি। তবে দ্বিতীয় পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমান।

নিজের পরিচিত কৌশলে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করে সফল হন নেমার। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। গোলের কিছুক্ষণ পরই শেষ বাঁশি বাজে।

ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলিয়ান তারকা। সতীর্থরা পরে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন।

চারটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল নেমারের।

ব্রাজিল কিছু সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। সবচেয়ে বড় সুযোগটি নষ্ট করেন তরুণ এনদ্রিক।

ভিনিসিয়ুসের দারুণ পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিলেও শেষ মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর শট পোস্টের বাইরে চলে যায়।

এই একটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ব্রাজিলের ফিনিশিং ছিল হতাশাজনক।

বিশ্বকাপ শেষে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ব্রাজিল দলে নিয়মিত গোল করবেন কে?

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র উইঙ্গার হয়েও দলের অন্যতম সেরা গোলদাতা। অথচ প্রকৃত স্ট্রাইকারের অভাব পুরো টুর্নামেন্টে ভুগিয়েছে দলকে।

রাফিনহার চোট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বিকল্প স্ট্রাইকারের অভাবে কোচ কার্লো আনচেলোত্তি বারবার কৌশল বদলালেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আগামী দিনের দল গঠনে এই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে ব্রাজিলকে।

নরওয়ের জয়ের অন্যতম নায়ক গোলরক্ষক অর্জান নাইল্যান্ড।

প্রথমার্ধে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি ঠেকানোর পাশাপাশি ম্যাচজুড়ে একাধিক দুর্দান্ত সেভ করেন তিনি। ভিনিসিয়ুস, কাসেমিরো এবং ব্রুনো গিমারায়েসের শট রুখে দিয়ে বারবার দলকে রক্ষা করেন।

তাঁর আত্মবিশ্বাসী গোলকিপিং ব্রাজিলের আক্রমণকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

একসময় ব্রাজিলের নাম শুনলেই প্রতিপক্ষ দল ভয়ে কাঁপত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

এই ম্যাচে ব্রাজিলের খেলায় ছিল না লড়াইয়ের মানসিকতা, ছিল না জয়ের তীব্র ইচ্ছা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও তারা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারেনি।

বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে এমন নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

গত দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। এবার আরও এক ধাপ আগে থামতে হলো তাদের। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দলটির জন্য এটি বড় ধাক্কা।

অন্যদিকে নরওয়ে দেখিয়ে দিল, শুধু তারকানির্ভর ফুটবল নয়, দলগত পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং কার্যকর কৌশল দিয়েও বড় দলকে হারানো সম্ভব।

আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে এখন কোয়ার্টার ফাইনালের পথে আত্মবিশ্বাসী। আর ব্রাজিলের সামনে শুরু হলো নতুন করে আত্মসমালোচনার অধ্যায়। আগামী বিশ্বকাপের আগে দল পুনর্গঠন, নতুন স্ট্রাইকার খুঁজে বের করা এবং হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা—এই তিনটিই এখন সেলেকাওদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।