বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়েই শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন নেমার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নিল না। শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। আর সেই পরাজয়ের সঙ্গেই শেষ হয়েছে ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ম্যাচ শেষে আবেগে ভেঙে পড়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেমার।
নরওয়ের বিপক্ষে নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ব্রাজিলের। তবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। পরাজয়ের হতাশার মধ্যেই নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেন নেমার।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। মাঠেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন ব্রাজিলিয়ান তারকা। সতীর্থরা এগিয়ে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ের ঘোষণা দেন।
নেমার বলেন, “আমি বহুবার চেষ্টা করেছি। দেশের হয়ে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে থামার সময় এসেছে। এখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল, এখানেই তার সমাপ্তি।”
বিশ্বকাপের আগে দীর্ঘদিন চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন নেমার। তবুও তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখে ব্রাজিল দলে জায়গা দেন প্রধান কোচ কার্লো আনচেলোত্তি।
ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও পুরোপুরি ফিট ছিলেন না তিনি। তাই টুর্নামেন্টের প্রথম চার ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। নরওয়ের বিপক্ষেও প্রথম একাদশে ছিলেন না। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে দলের আক্রমণে গতি আনার চেষ্টা করেন।
ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে ব্যবধান কমালেও ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত হতাশাই সঙ্গী হয় তাঁর।
২০১০ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয় নেমারের। এরপর টানা ১৬ বছর দেশের হয়ে অসাধারণ ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১২৯টি ম্যাচ খেলে করেছেন ৮০টি গোল, যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গোল করার পাশাপাশি অসংখ্য অ্যাসিস্ট ও ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্সে দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
নেমারের ক্যারিয়ার শুধুই ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্সে ব্রাজিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিরোপাও জিতেছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেমারের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে অলিম্পিক এবং কনফেডারেশন্স কাপের সাফল্য।
তিনি ব্রাজিলকে এনে দিয়েছেন—
- ২০১২ সালের অলিম্পিক গেমসে রৌপ্য পদক
- ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপের শিরোপা
- ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক
বিশেষ করে ২০১৬ সালের অলিম্পিকে ব্রাজিলের প্রথম ফুটবল স্বর্ণপদক জয়ে নেমারের অবদান ছিল অনন্য।
নেমারের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপ। তিনি ব্রাজিলের হয়ে চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। প্রতিবারই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে মাঠে নেমেছিল সেলেসাওরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হয়নি।
চলতি বিশ্বকাপেও তাঁর খেলা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। চোট কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দলে জায়গা পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে নিজের সেরাটা তুলে ধরার সুযোগ পাননি। শেষ ম্যাচে গোল করেও দলকে জেতাতে না পারার হতাশা নিয়েই বিদায় নিতে হলো তাঁকে।
নেমারের বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিল ফুটবলের একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি ছিলেন দলের আক্রমণের মূল ভরসা, সৃজনশীলতার প্রতীক এবং কোটি সমর্থকের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং, গতিময় ফুটবল, গোল করার দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাঁকে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মাঠ ছাড়ার সময় নেমারের চোখের জল যেন বলে দিচ্ছিল, দেশের জার্সির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ না হলেও ব্রাজিল ফুটবলে তাঁর অবদান কখনোই মুছে যাবে না।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও নেমারের নাম চিরকাল লেখা থাকবে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি পাতায়। সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তাঁর রেকর্ড, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত এবং দেশের জন্য আত্মনিবেদিত পারফরম্যান্স ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তাঁর হাতে ওঠেনি, কিন্তু কোটি ব্রাজিল সমর্থকের হৃদয়ে নেমার সবসময়ই একজন কিংবদন্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

