জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এই মামলায় হাসানুল হক ইনুই ছিলেন একমাত্র আসামি। রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনে। অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলন দমনে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ।
ট্রাইব্যুনাল দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগগুলোর প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং উপস্থাপিত নথিপত্র মূল্যায়ন করে এই রায় প্রদান করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে বিভিন্ন মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হওয়ার পর ২২ জুন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং পরে ৩০ জুন রায় ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় হাসানুল হক ইনু বিভিন্নভাবে আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—
প্রথমত, ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো।
দ্বিতীয়ত, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে উপস্থিত থেকে আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তে সমর্থন, প্ররোচনা ও সহযোগিতা করা।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রস্তুত এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে তাদের আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে হামলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ ছিল গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সরকারি দমন-পীড়নকে সমর্থন করা।
ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
সপ্তম অভিযোগে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়।
অষ্টম এবং সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী এবং আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সারা দেশে সহিংসতায় শত শত মানুষের মৃত্যু ও হাজারো মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, শেখ হাসিনা ও হাসানুল হক ইনুর মধ্যে হওয়া টেলিফোন আলাপের ট্রান্সক্রিপ্ট এবং বিশেষজ্ঞ মতামত মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ ব্যবহারের কৌশল এবং ৫ আগস্ট কারফিউ প্রত্যাহারের পর ঢাকায় দলীয় লোকসমাগম ঘটানোর পরিকল্পনার বিষয় উঠে আসে।
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়। ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। এদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী, বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, জব্দ তালিকার সাক্ষী, জেলার এবং তদন্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের পক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষী আদালতে বক্তব্য দেন।
এছাড়া মামলায় ২০ সিরিজের নথিপত্র এবং পাঁচটি আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
বিচার চলাকালে হাসানুল হক ইনু নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে তিনি সব অভিযোগকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রোশ থেকে মামলা করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
পরবর্তীতে পুনর্তদন্ত এবং নতুন সাক্ষী তলবের আবেদন করলেও ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর আসামিপক্ষ টানা কয়েকদিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ইনুর খালাস দাবি করে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. মিজানুল ইসলাম আদালতে বলেন, হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তার দাবি, ইনু প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশ হিসেবে সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও অভিযোগ করে, বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘সংঘাত’ ও ‘অস্থিরতা’ হিসেবে উল্লেখ করে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিরোধিতা করেছে।
১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন হাসানুল হক ইনু। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭২ সালে জাসদ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন। পরে ১৯৮৬ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদীয় রাজনীতিতে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করেই ট্রাইব্যুনাল হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।


