নিজস্ব প্রতিবেদক, বনগাঁ: সরকারি পথে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ থাকার পরও বাজারে ‘বাংলাদেশি ইলিশ’ নামে মাছ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়। অভিযোগ, বাংলাদেশি ইলিশের পরিচয় দিয়ে অন্য রাজ্য থেকে আসা মাছ চড়া দামে বিক্রি করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছে ভারতীয় মজদুর সংঘের বনগাঁ নগর কমিটি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বুধবার রাতে বনগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যখন সরকারি ভাবে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি হচ্ছে না, তখন বাজারে বিক্রি হওয়া ‘বাংলাদেশি ইলিশ’-এর উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশি ইলিশ আমদানি বন্ধ, তবু বাজারে ‘বাংলাদেশি ইলিশ’
বনগাঁর বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের নাম করে মাছ বিক্রির অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি ভাবে আমদানি বন্ধ থাকলে বাজারে যে মাছকে বাংলাদেশি ইলিশ বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো আসছে কোথা থেকে?
ভারতীয় মজদুর সংঘের বনগাঁ নগর কমিটির অভিযোগ, ক্রেতাদের একাংশ বাংলাদেশি ইলিশ মনে করে চড়া দামে মাছ কিনছেন। কিন্তু সেই মাছ আদৌ বাংলাদেশ থেকে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে মাছের উৎস সম্পর্কে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গুজরাট, মহারাষ্ট্র বা অসম থেকে আসছে মাছ?
অভিযোগকারীদের অনুমান, বাজারে যে মাছকে বাংলাদেশি ইলিশ বলে বিক্রি করা হচ্ছে, তার কিছু অংশ হয়তো ভারতের অন্য রাজ্য থেকে আসছে। বিশেষ করে গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং অসম থেকে আসা ইলিশকে বাংলাদেশি মাছের পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে এই বিষয়টি এখনও অভিযোগ ও অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনিক তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া মাছগুলোর প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ভারতীয় মজদুর সংঘের বক্তব্য, ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
থানায় লিখিত অভিযোগ ভারতীয় মজদুর সংঘের
বিষয়টি নজরে আসার পর বুধবার রাতে বনগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেয় ভারতীয় মজদুর সংঘের বনগাঁ নগর কমিটি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে মূলত মাছের উৎস শনাক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। বাজারে ‘বাংলাদেশি ইলিশ’ নামে যে মাছ বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর আমদানির নথি এবং সরবরাহের পথ খতিয়ে দেখার আবেদন করা হয়েছে।
পাশাপাশি, যদি কোনও ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্য মাছকে বাংলাদেশি ইলিশ বলে বিক্রি করে থাকেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
কী বলছে ভারতীয় মজদুর সংঘ?
সংগঠনের সম্পাদক রাজীব গোস্বামীর দাবি, বর্তমানে সরকারি ভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আমদানি হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি ইলিশের নামে চড়া দামে মাছ বিক্রির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানিয়েছেন, এমন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হবে।
সংগঠনের অভিযোগের মূল বিষয় হলো, ক্রেতারা বাংলাদেশি ইলিশ ভেবে বেশি দাম দিয়ে মাছ কিনছেন কি না এবং বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের প্রকৃত উৎস কী—এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।
বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা
অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে নতুন করে আশার কথা শোনা যাচ্ছে ব্যবসায়ী মহলে।
সম্প্রতি ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সফর করে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির উপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার আবেদন জানানো হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিবের সঙ্গেও প্রতিনিধি দলের আলোচনা হয়েছে বলে খবর।
ব্যবসায়ীদের একাংশের আশা, আগের বছরগুলোর মতো এ বছরও দুর্গাপুজো উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ পাঠানোর বিষয়ে কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ
পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুজোর মরসুমে বাংলাদেশি ইলিশের চাহিদা সাধারণত বাড়ে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমদানি সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাজারে কোনও মাছকে ‘বাংলাদেশি ইলিশ’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বনগাঁয় ওঠা অভিযোগ সেই বিতর্ককেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ক্রেতাদের কী বলছে এই অভিযোগ?
এই ঘটনায় ক্রেতাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। কোনও মাছকে বাংলাদেশি ইলিশ বলে দাবি করা হলেই সেটি বাংলাদেশ থেকে এসেছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মাছের উৎস এবং আমদানির বৈধ নথি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে বাংলাদেশি ইলিশের নামে যদি অন্য মাছ বেশি দামে বিক্রি করা হয়ে থাকে, তাহলে তা ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হতে পারে।
এখন নজর প্রশাসনের তদন্তের দিকে। বাজারে বিক্রি হওয়া ‘বাংলাদেশি ইলিশ’-এর প্রকৃত উৎস কী, অভিযোগের সত্যতা কতটা এবং কোনও ব্যবসায়ী বেআইনি ভাবে ক্রেতাদের ভুল তথ্য দিয়ে মাছ বিক্রি করছেন কি না—তদন্তের পরই তা স্পষ্ট হবে।





