আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : আজকের পৃথিবীতে বিছে দেখলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়। কিন্তু প্রায় ৪১ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে বিচ্ছেদের আকার কেমন ছিল, তা জানলে অবাক হতে হয়। সেই প্রাচীন পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত প্রায় ১ মিটার বা ৩ ফুট লম্বা এক দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছে!
সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, এই প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ নতুন করে পাওয়া যায়নি। এর জীবাশ্ম প্রায় দেড়শো বছর ধরে একটি যাদুঘরের সংগ্রহে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু এতদিন বিজ্ঞানীরা বুঝতেই পারেননি, সেই পুরনো জীবাশ্মের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে কত বড় এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর গল্প।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জীবাশ্মটি নতুন করে বিশ্লেষণ করার পর সামনে এসেছে সেই বিস্ময়কর তথ্য।
৪১ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ছিল দৈত্যাকার বিছে
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাণীটির নাম প্রিয়ার্কটুরাস গিগাস (Praearcturus gigas)। প্রায় ৪১৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ৪১ কোটি বছর আগে বর্তমান ব্রিটেনের এলাকায় এই বিশাল কাঁকড়াবিছের অস্তিত্ব ছিল।
সেই সময়ের পৃথিবী আজকের পৃথিবীর মতো ছিল না। বিশাল বনভূমি তো দূরের কথা, স্থলভাগে বড় বড় গাছের আধিপত্যও তখন তৈরি হয়নি। অথচ সেই সময়েই পৃথিবীর মাটিতে বিচরণ করত প্রায় এক মিটার লম্বা এই বিশাল সন্ধিপদ প্রাণী।
ভাবুন, আজকের একটি ছোট বিছের সঙ্গে যার আকারের কোনো তুলনাই হয় না—সেই প্রাণীই প্রায় ৩ ফুট লম্বা ছিল!
আধুনিক প্রযুক্তিতে খুলল পুরনো জীবাশ্মের রহস্য
প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসের জীবাশ্ম বহু বছর ধরে মিউজিয়ামের সংগ্রহে ছিল। কিন্তু পুরনো নমুনাটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট ছিল না।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবাশ্মের গঠন নতুন করে পরীক্ষা করা হয়। সেই বিশ্লেষণ থেকেই প্রাণীটির বিশাল আকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, শুধু প্রাণীটির সামনের শক্তিশালী দাঁড়ার দৈর্ঘ্যই ছিল ১৬ সেন্টিমিটারের বেশি। এই তথ্য থেকে প্রাণীটির সামগ্রিক আকার সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, মিউজিয়ামের তাকেই পড়ে ছিল এমন একটি জীবাশ্ম, যার মধ্যে লুকিয়ে ছিল প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর এক দৈত্যাকার শিকারির গল্প।
কার্বনিফেরাস যুগের দৈত্যদেরও আগে
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর বিশাল পোকামাকড়ের কথা উঠলে সাধারণত কার্বনিফেরাস যুগের কথা মনে পড়ে। সেই সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু সন্ধিপদ প্রাণী অস্বাভাবিক বড় আকার ধারণ করেছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসের ক্ষেত্রে সময়টা আরও চমকপ্রদ।
এই প্রাণী কার্বনিফেরাস যুগের বিখ্যাত দৈত্যাকার সন্ধিপদদের প্রায় ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি বছর আগেই পৃথিবীতে বিচরণ করত।
অর্থাৎ, পৃথিবীতে দৈত্যাকার সন্ধিপদ প্রাণীর ইতিহাস বিজ্ঞানীরা যতটা পুরনো বলে ভাবতেন, এই জীবাশ্ম সেই ইতিহাসকে আরও পেছনে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে।
তখনও তৈরি হয়নি বড় বড় জঙ্গল
প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসের আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর সময়কাল।
আজকের পৃথিবীতে বড় গাছ, ঘন জঙ্গল এবং বিস্তীর্ণ বনভূমি আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছে যখন পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন স্থলভাগে সেই ধরনের বিশাল বনভূমির বিকাশ এখনও শুরু হয়নি।
অর্থাৎ, গাছপালার ব্যাপক বিস্তার ঘটার আগেই পৃথিবীতে এমন একটি প্রাণী ছিল, যার দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটারের কাছাকাছি।
এই তথ্য প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ ও প্রাণীদের বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
স্থলচর, নাকি জল-স্থল দুই জায়গাতেই চলত?
তবে প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসকে ঘিরে সব রহস্য এখনও সমাধান হয়নি।
গবেষকেরা এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, প্রাণীটি সম্পূর্ণভাবে স্থলভাগে বসবাস করত কি না। এটি জল ও স্থল—দুই পরিবেশেই চলাফেরা করত কি না, সেটিও এখনও গবেষণার বিষয়।
প্রাণীটির দেহের গঠন এবং পাওয়া জীবাশ্ম থেকে তার জীবনযাপন সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া গেলেও, সে ঠিক কীভাবে চলাফেরা করত বা কোথায় বেশি সময় কাটাত, তা নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।
১৫০ বছর ধরে মিউজিয়ামে ছিল অজানা ইতিহাস
এই আবিষ্কারের আরেকটি দিক বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নতুন করে প্রাণীটি আবিষ্কার করা হয়নি; বরং পুরনো একটি জীবাশ্মের মধ্যেই নতুন তথ্য খুঁজে পাওয়া গেছে।
প্রায় দেড়শো বছর ধরে মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা নমুনাটি যেন অপেক্ষা করছিল আধুনিক প্রযুক্তির জন্য।
বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, পুরনো জীবাশ্মও নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বহু বছর আগে সংগ্রহ করা নমুনার মধ্য থেকেও নতুন প্রজাতি, নতুন বৈশিষ্ট্য কিংবা পৃথিবীর অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসছে।
প্রিয়ার্কটুরাস গিগাস তারই একটি চমকপ্রদ উদাহরণ।
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী কতটা অদ্ভুত ছিল?
আজকের পৃথিবীর সঙ্গে ৪১ কোটি বছর আগের পৃথিবীর তুলনা করলে পার্থক্যটা সহজেই বোঝা যায়। তখনকার পরিবেশ, জলবায়ু, উদ্ভিদজগৎ এবং প্রাণীদের জীবনযাপন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেই পৃথিবীতেই প্রায় এক মিটার লম্বা একটি দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছে ঘুরে বেড়াত। চারপাশে আজকের মতো ঘন জঙ্গল না থাকলেও সে নিজের পরিবেশে টিকে ছিল।
এই জীবাশ্ম তাই শুধু একটি বিশাল প্রাণীর আকার সম্পর্কে তথ্য দেয় না। এটি পৃথিবীতে প্রাণীর বিবর্তন, প্রাচীন পরিবেশ এবং সন্ধিপদ প্রাণীদের ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
পুরনো জীবাশ্মেই লুকিয়ে থাকে নতুন আবিষ্কার
প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসের ঘটনা বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নতুন আবিষ্কার মানেই সবসময় নতুন জায়গায় খনন করে নতুন জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া নয়। অনেক সময় বহু বছর ধরে সংরক্ষিত পুরনো নমুনাকেও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন করে পরীক্ষা করলে অজানা তথ্য সামনে আসে।
প্রায় ১৫০ বছর ধরে মিউজিয়ামে থাকা একটি জীবাশ্ম শেষ পর্যন্ত খুলে দিয়েছে সাড়ে ৪১ কোটি বছর আগের এক দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছের রহস্য।
পৃথিবীর ইতিহাসের বিশাল অংশ এখনও আমাদের অজানা। আর মাটির নিচে কিংবা মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা প্রতিটি জীবাশ্ম সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একটি করে পৃষ্ঠা। প্রিয়ার্কটুরাস গিগাসের মতো আবিষ্কার সেই পৃষ্ঠাগুলোকে নতুন করে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।





