বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে আবেগে ভাসলেন লিওনেল মেসি। শুধু শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নয়, এই ম্যাচ তাঁর কাছে আরও গভীর অর্থ বহন করছে। একদিকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ স্পেন—যে দেশের মাটিতে তিনি বেড়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। এমন ঐতিহাসিক ফাইনালের আগে সামাজিক মাধ্যমে পুরো আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন মেসি। তাঁর সেই পোস্টে ফুটে উঠেছে ঐক্য, কৃতজ্ঞতা, গর্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এক আবেগময় ইঙ্গিত, যা অনেকের কাছেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর বিদায়ের আভাস বলে মনে হয়েছে।
ফাইনালের আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো আর্জেন্টিনা দলের একটি ছবি প্রকাশ করেন লিওনেল মেসি। ছবিতে শুধু ফুটবলাররাই নন, ছিলেন কোচিং স্টাফ, চিকিৎসক, ফিজিও, সাপোর্ট স্টাফ এবং দলের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করা প্রতিটি সদস্য।
ছবির সঙ্গে দেওয়া বার্তায় মেসি লিখেছেন, এই দল কেবল একটি স্কোয়াড নয়, এটি একটি পরিবার। গত কয়েক বছরে অর্জিত ট্রফিগুলোর চেয়েও তাঁদের একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, সংগ্রাম, সাফল্য এবং কঠিন সময় অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
তিনি জানান, প্রতিদিন সতীর্থদের সঙ্গে কাজ করা, অনুশীলন করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্মৃতিগুলো সারাজীবন তাঁর মনে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি ধন্যবাদ জানান সেই সব মানুষকে, যারা প্রতিদিন আর্জেন্টিনা দলকে একটি পরিবারের মতো ধরে রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন।
মেসির বার্তার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তাঁর শেষ কয়েকটি বাক্য। তিনি লিখেছেন, ফাইনালের ফল যাই হোক না কেন, এই দল ইতোমধ্যেই এমন একটি ইতিহাস রচনা করেছে, যা কখনও মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
এই বক্তব্য অনেক সমর্থকের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসর নিয়ে আলোচনা চলছে। তাই তাঁর এই আবেগঘন ভাষা অনেকের কাছেই বিদায়ের পূর্বাভাস বলে মনে হয়েছে।
যদিও তিনি সরাসরি অবসরের কথা বলেননি, তবুও বক্তব্যের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, অর্জনের গর্ব এবং ভবিষ্যৎকে ঘিরে এক আবেগময় উপলব্ধি।
শুধু আবেগ নয়, ফাইনালের আগে সতীর্থদের উজ্জীবিত করতেও ভোলেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তিনি লিখেছেন, পুরো দেশ ইতোমধ্যেই একটি বিশেষ যাত্রার সাক্ষী হয়েছে। সেমিফাইনালে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর মুহূর্ত থেকেই দলের প্রত্যেক সদস্য বুঝতে পেরেছিলেন, সমর্থকদের কাছে ম্যাচটির গুরুত্ব কতটা ছিল।
বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয় এবং আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা পুরো দেশের মানুষকে আনন্দে ভাসিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মেসির মতে, আর্জেন্টিনার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারাই তাঁদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সেই আনন্দই খেলোয়াড়দের আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে।
নিজের পোস্টে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথাও শেয়ার করেছেন মেসি।
তিনি জানান, তাঁর মা এবং পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের আনন্দ-উৎসবের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছেন। সাধারণ মানুষের সেই উদযাপন তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
মেসি বলেন, দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পারা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একজন ফুটবলার হিসেবে এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না।
বিশ্বকাপের এই যাত্রা যে সহজ ছিল না, সেটিও স্পষ্ট করে বলেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
তিনি জানান, পুরো দল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই টুর্নামেন্টের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে। কঠোর অনুশীলন, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য সবাই সর্বোচ্চ পরিশ্রম করেছেন।
মেসির ভাষায়, এখন আর অতীতের শিরোপা বা আগের অর্জন নিয়ে ভাবার সময় নয়। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য বর্তমানকে উপভোগ করা এবং নিজেদের সেরাটা মাঠে তুলে ধরা।
মেসি জোর দিয়ে বলেন, এই আর্জেন্টিনা দল কখনও হাল ছেড়ে দেয় না।
প্রতিটি ম্যাচে তারা নিজেদের ফুটবল দর্শন, আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে। কঠিন পরিস্থিতিতেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই দলটিকে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।
তাঁর মতে, এই দল কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার জন্য নয়, বরং নিজেদের বিশ্বাস এবং পরিশ্রমের শক্তিতেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
এই ফাইনাল মেসির ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল।
২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে পরাজিত হয়ে রানার্স-আপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই হার আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে তাজা।
এরপর ২০২২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে নাটকীয় লড়াইয়ে হারিয়ে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি। সেই জয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা দূর করেন তিনি।
এবার তাঁর সামনে আরও একটি ঐতিহাসিক সুযোগ—টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে নতুন ইতিহাস গড়া।
এই ফাইনাল মেসির কাছে শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। কারণ প্রতিপক্ষ স্পেনের সঙ্গে তাঁর জীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
শৈশবে বার্সেলোনায় এসে ফুটবলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। স্পেনেই বিশ্বসেরা তারকায় পরিণত হন, জেতেন অসংখ্য ট্রফি এবং সৃষ্টি করেন অগণিত রেকর্ড।
তাই স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনাল তাঁর জন্য আবেগ, স্মৃতি এবং দায়িত্ব—সবকিছুর এক অনন্য মেলবন্ধন।
বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এটাই কি আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ বড় ম্যাচ?
এর উত্তর এখনই জানা সম্ভব নয়। তবে তাঁর সাম্প্রতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তিনি এই দলকে নিজের পরিবারের মতোই ভালোবাসেন। ট্রফি জিতুন বা না জিতুন, সতীর্থদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং দেশের মানুষের ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।
ফাইনালের আগে মেসির এই আবেগঘন বার্তা শুধু আর্জেন্টিনা শিবিরকেই অনুপ্রাণিত করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—মহান খেলোয়াড়দের আসল পরিচয় শুধু ট্রফিতে নয়, তাঁদের নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং দলের প্রতি অটুট ভালোবাসায়।

