খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালআর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গোপন মন্ত্র! মিষ্টি, পবিত্র ধোঁয়া, লাকি চার্মে জয়ের বিশ্বাস

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গোপন মন্ত্র! মিষ্টি, পবিত্র ধোঁয়া, লাকি চার্মে জয়ের বিশ্বাস

বিশ্বাস করা হয়, এই সুগন্ধি কাঠের ধোঁয়া নেতিবাচক শক্তি দূর করে এবং মানসিক শান্তি এনে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তারা হোটেলের বিভিন্ন অংশে এই ধোঁয়া ছড়িয়ে ধ্যানও করেন।

ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকের কাছে এটি আবেগ, বিশ্বাস এবং কখনও কখনও কুসংস্কারেরও নাম। প্রিয় দলের জয় নিশ্চিত করতে অনেকেই নিজের মতো করে নানা রীতি মেনে চলেন। কেউ নির্দিষ্ট জার্সি পরে ম্যাচ দেখেন, কেউ একই জায়গায় বসে থাকেন, আবার কেউ ম্যাচের দিন বিশেষ কিছু খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

তবে শুধু সমর্থকরাই নন, ফুটবলার ও কোচদের মধ্যেও এমন বিশ্বাসের অভাব নেই। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট। বিশ্বকাপের মঞ্চে বারবার সাফল্য পাওয়া এই দলটি বছরের পর বছর ধরে নানা রকম আচার, রীতি ও সৌভাগ্যের প্রতীককে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তাদের ভাষায় এসবই “কাবালা”, অর্থাৎ সৌভাগ্য ডেকে আনার বিশেষ অভ্যাস।

আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে কাবালার গুরুত্ব অনেক পুরোনো। ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত অভ্যাস এবং কুসংস্কারের এক অদ্ভুত মিশ্রণই গড়ে তুলেছে এই ঐতিহ্য।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের আগে দলের খেলোয়াড়রা উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনার ভার্জিন অব কোপাকাবানা মন্দিরে প্রার্থনা করেছিলেন। তখন তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ জিতলে আবার সেখানে ফিরে যাবেন। কিন্তু শিরোপা জয়ের পর সেই প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করা হয়নি।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ১৯৯০, ২০১৪-সহ একাধিক বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। অনেক সমর্থক বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কারণেই দলটি যেন অভিশপ্ত হয়ে পড়েছিল।

অবশেষে ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ক্লদিও “চিকি” তাপিয়া বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে গিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনেকের মতে, সেখানেই সেই পুরোনো অভিশাপের সমাপ্তি ঘটে।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের আলাদা ট্রফি! বৈষম্য নাকি সম্মান?

বিশ্বকাপের আগে লিওনেল মেসির বিশেষ একজোড়া বুটকে আশীর্বাদ করানো হয়েছিল। “এল উলতিমো ট্যাঙ্গো” নামে পরিচিত সেই বুট আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক বাসিলিকা দে লুহানে নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আশীর্বাদ নেওয়া হয়।

মেসিও নিজের নিরাপত্তা ও দলের সাফল্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। এরপর বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এই ঘটনাকে আরও কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেসের একটি বিশেষ অভ্যাস রয়েছে। প্রতিটি ম্যাচ শুরুর আগে তারা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঠিক ১৪টি মিষ্টি চিবিয়ে খান।

এই রীতির পেছনে রয়েছে ডি পলের শৈশবের স্মৃতি। ছোটবেলায় তার দাদা স্কুল বা অনুশীলনের পর তাকে কয়েকটি কয়েন দিতেন, যাতে সে মিষ্টি কিনতে পারে। পরে তিনি জানতে পারেন, দাদা নিজের বাসভাড়া বাঁচিয়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরতেন, শুধু নাতিকে খুশি করার জন্য।

আজ সেই স্মৃতিই পরিণত হয়েছে সৌভাগ্যের প্রতীকে।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বহু বছর ধরে একটি নিয়ম মেনে চলেন। তিনি সবসময় মাঠে প্রথমে ডান পা রাখেন।

তার বিশ্বাস, ফুটবল জীবন শুরু করার পর থেকেই তিনি এটি করে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। ম্যাচের ফল যাই হোক, এই অভ্যাস বদলানোর কোনো ইচ্ছা তার নেই।

ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ম্যাচের আগে পালো সান্তো নামের পবিত্র কাঠের ধোঁয়া ব্যবহার করেন।

বিশ্বাস করা হয়, এই সুগন্ধি কাঠের ধোঁয়া নেতিবাচক শক্তি দূর করে এবং মানসিক শান্তি এনে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তারা হোটেলের বিভিন্ন অংশে এই ধোঁয়া ছড়িয়ে ধ্যানও করেন।

আরও পড়ুন :  মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা নিয়ে সংসদে আলোচনা:দাবি ভাতা বৃদ্ধির

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার সময় নিউ জার্সির একটি নির্দিষ্ট হোটেলে অবস্থান করেছিল আর্জেন্টিনা দল। সেই টুর্নামেন্টে সাফল্যের পর একই হোটেল এবং একই ধরনের রুটিন বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

খেলোয়াড়দের বিশ্বাস, পরিচিত পরিবেশ তাদের মানসিকভাবে স্বস্তি দেয় এবং ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে-ও নিজের ব্যক্তিগত কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন।

তিনি বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামে না গিয়ে নিজের বাসভবন থেকেই ম্যাচ দেখেন। এমনকি একটি নির্দিষ্ট জ্যাকেটও নিয়মিত পরে থাকেন। এক ম্যাচে জ্যাকেট খুলে রাখার পরই প্রতিপক্ষ গোল করেছিল। এরপর থেকে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর সেটি খোলেন না।

বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ জয়গুলোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসি প্রায় একই ধরনের বার্তা প্রকাশ করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠার পর তার দেওয়া পোস্টটি অনেক সমর্থকের নজর কাড়ে, কারণ সেটি ২০২২ সালের ফাইনালে ওঠার সময় দেওয়া বার্তার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়।

অনেকের মতে, এটিও তার সৌভাগ্যের অংশ।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস বিলার্দোর ছিল এক অদ্ভুত বিশ্বাস।

তিনি মনে করতেন, মুরগির মাংস দলের জন্য অশুভ। তাই পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে খেলোয়াড়দের খাবারের তালিকা থেকে মুরগি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছিল।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই বছরই বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ে আর্জেন্টিনা।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ নকআউট পর্বে প্রায়ই নিজের চুলে আর্জেন্টিনার পতাকার নকশা করান।

আরও পড়ুন :  ওসমান হাদির মামলায় নতুন বিতর্ক! বোন মাসুমা হাদির বিস্ফোরক প্রশ্ন

২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার মতো এবারও তিনি একই স্টাইল বজায় রেখেছেন। সমর্থকদের মতে, এটি শুধু দেশপ্রেম নয়, বরং সৌভাগ্যেরও প্রতীক।

আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের অন্যতম প্রিয় খাবার আসাদো, যা ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ।

বিশ্বকাপ চলাকালে প্রায় প্রতিটি ম্যাচের আগে দলটি একসঙ্গে আসাদো আয়োজন করে। গান, আড্ডা এবং পারিবারিক পরিবেশ খেলোয়াড়দের চাপ কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।

আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক প্রতিপক্ষের পারফরম্যান্স খারাপ করার জন্য নানা প্রতীকী কাজও করে থাকেন।

কেউ “ছোট শিং” হাতের ইশারা ব্যবহার করেন, আবার কেউ প্রতিপক্ষ দলের নাম কাগজে লিখে ফ্রিজে রেখে দেন। যদিও অনেক সমর্থক এসব নেতিবাচক রীতি থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন এতে খারাপ কর্মফল ফিরে আসতে পারে।

ফুটবলে জয়ের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন দক্ষতা, কৌশল, কঠোর অনুশীলন এবং মানসিক দৃঢ়তা। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতি দেখায়, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ছোট ছোট রীতি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসও অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মেসির ভাগ্যবান বুট, ডি পলের ১৪টি মিষ্টি, স্কালোনির ডান পা, পালো সান্তোর ধোঁয়া কিংবা এমি মার্টিনেজের বিশেষ হেয়ারস্টাইল—এসবের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও এগুলো খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারণ করে মাঠের পারফরম্যান্সই। তবু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস প্রমাণ করে, বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং দলীয় ঐক্যও কখনও কখনও একটি দলের যাত্রাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

আর্কাইভ