বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই শুধু গোল, উত্তেজনা আর জয়ের গল্প নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংস্কৃতি, বিশ্বাস আর ব্যক্তিগত মূল্যবোধও। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ঘিরে এমনই এক বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়। প্রশ্নটা ছিল সহজ—কেন কিছু ফুটবলারের জন্য ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ ট্রফি একটু আলাদা?
চল, সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নিই।
বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষে যে খেলোয়াড় সেরা পারফরম্যান্স দেখান, তাকে দেওয়া হয় ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার। এই পুরস্কারের ট্রফি আর ব্যাকড্রপে থাকে স্পনসর কোম্পানির নাম। এখানেই তৈরি হয় সমস্যা।
কারণ, ওই স্পনসর ছিল একটি মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। আর ইসলাম ধর্মে মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে মুসলিম ফুটবলারদের জন্য এই ট্রফি গ্রহণ করা অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।
২০২২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপে একটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। কিন্তু ট্রফিতে থাকা মদ প্রস্তুতকারী সংস্থার লোগো তিনি হাতে ঢেকে রাখেন। এমনকি ছবি তোলার সময়ও তিনি সেই লোগো প্রকাশ করতে চাননি।
এই কাজের জন্য তাকে জরিমানাও গুনতে হয়। কিন্তু তবুও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। এখান থেকেই ব্যাপারটা বড় আলোচনায় আসে।
ভাবো তো, তুমি যদি এমন কিছু হাতে ধরতে বাধ্য হও, যেটা তোমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়—তাহলে কেমন লাগবে? ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এমবাপে।
ফিফা বিষয়টা বুঝতে পারে। তারা বুঝে যে এটা কোনো বৈষম্যের প্রশ্ন নয়, বরং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়।
তাই মুসলিম ফুটবলারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যখন কোনো মুসলিম খেলোয়াড় ম্যাচের সেরা হন, তখন তাকে এমন একটি ট্রফি দেওয়া হয়, যেখানে মদ প্রস্তুতকারী সংস্থার লোগো বা নাম থাকে না। শুধু তাই নয়, ছবি তোলার সময় ব্যাকড্রপ থেকেও সেই লোগো সরিয়ে দেওয়া হয়।
মানে, পুরো সেটআপটাই একটু বদলে দেওয়া হয়—যাতে খেলোয়াড় স্বস্তিতে থাকতে পারেন।
মিশরের মোহাম্মদ সালাহ বা মরক্কোর আশরাফ হাকিমির মতো অনেক মুসলিম ফুটবলার তাদের ধর্মীয় নিয়ম খুব গুরুত্ব দিয়ে মানেন। তারা চান না, কোনোভাবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগুক।
এই কারণে ফিফার এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য অনেকটাই স্বস্তির হয়ে দাঁড়ায়।
এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে আছে আগের কিছু ঘটনা।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে মিশরের গোলরক্ষক মোহামেদ এল শেনায়ি উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হন। কিন্তু ট্রফিতে মদের ব্র্যান্ডের লোগো থাকায় তিনি সেটি নিতে অস্বীকার করেন।
এই ঘটনা তখন বেশ আলোড়ন তোলে। অনেকেই এটাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন, আবার কেউ কেউ প্রশ্নও তোলেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ফিফা বুঝে যায়—আগে থেকেই সমাধান করা ভালো, পরে সমস্যা সামলানোর চেয়ে।
অনেকে প্রথমে ভেবেছিলেন, এটা হয়তো বৈষম্য। কেন একজনের জন্য একরকম, আরেকজনের জন্য অন্যরকম?
কিন্তু আসলে বিষয়টা উল্টো।
এটা কাউকে আলাদা করে দেওয়া নয়, বরং সবাইকে নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা। যেমন ধরো, কেউ নিরামিষভোজী হলে তাকে আলাদা খাবার দেওয়া হয়—এটা কি বৈষম্য? না, বরং সম্মান।
ঠিক তেমনই, এখানে ফিফা চেষ্টা করেছে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সম্মান জানাতে।
এই পুরো ঘটনা একটা বড় বিষয় শেখায়—খেলাধুলা শুধু মাঠের লড়াই না। এখানে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ফিফা যখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা আসলে একটা বার্তা দেয়—সবাইকে নিয়ে এগোনোর।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ছোট একটা পরিবর্তনও অনেক বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মুসলিম ফুটবলারদের জন্য আলাদা ট্রফি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়তো বাইরে থেকে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু যাদের জন্য এটা করা হয়েছে, তাদের কাছে এর মূল্য অনেক বেশি।
এটা শুধু একটা ট্রফি নয়, এটা সম্মানের প্রতীক।
আর শেষ পর্যন্ত, খেলাধুলার আসল সৌন্দর্যই তো এখানে—সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলা, সবার জায়গাটাকে সম্মান করা।

